শিরোনাম
 উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে নৌকায় ভোট দিন: প্রধানমন্ত্রী  মৌলভীবাজারে 'জঙ্গি আস্তানায়' অভিযানে সোয়াট  রাজশাহীতে বিদেশি ছাত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার  শ্যামল কান্তিকে লাঞ্ছনা: সেলিম ওসমানকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ২২:২৯:৩০

সৌদি আরব থেকে তরুণীর আকুতি

নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি
'আম্মা, আম্মাগো, আমারে বাঁচাও। আমারে বেইজ্জতি থাইকা বাঁচাও। বাবা আমারে বাঁচাও।' এ আকুতি সৌদি আরবে গৃহপরিচারিকার কাজ করতে যাওয়া হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের কায়স্থ গ্রামের এক তরুণীর।

দরিদ্র পিতা-মাতার মুখে হাসি ফোটাতে দালালের সহযোগিতায় গত ৬ ডিসেম্বর তিনি গৃহকর্মীর চাকরি নিয়ে সৌদি আরবের দাম্মাম শহরে যান। এরপর তার ওপর শুরু হয় শারীরিক ও পাশবিক নির্যাতন। সেখানকার দালাল তাকে টাকার বিনিময়ে তিন-চার দিনের জন্য একেকজন সৌদি নাগরিকের কাছে পাঠায়। বিষয়টি টেলিফোনে বাবা-মাকে জানিয়ে তাকে উদ্ধার করার আকুতি জানান মেয়েটি। পাশাপাশি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানসহ রাজনৈতিক নেতাদের কাছে যাওয়ারও পরামর্শ দেন। এরপর তরুণীর বাবা-মা মোবাইল ফোনের ওই কথোপকথনের আধাঘণ্টার রেকর্ড নিয়ে ছুটে যান হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীর কাছে। পরে ওই তরুণীর পরিবার এ ঘটনায় নবীগঞ্জ থানায় মামলা করে।

এমপি কেয়া চৌধুরীর প্রচেষ্টায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরা গত বুধবার দুপুরে ঢাকার পল্টনের গ্রিন বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে অভিযান চালিয়ে দালাল চক্রের তিন সদস্যকে আটক করেন। তারা হলো- হবিগঞ্জ সদর উপজেলার শায়েস্তাগঞ্জ থানার ফরিদপুর গ্রামের রমিজ আলীর ছেলে আবু তাহের, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কাওলিয়া গ্রামের আব্দুল হাশিমের ছেলে এরশাদ উল্লা ও ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার বাগদানা গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে শাহজানুর।

এ সময় নবীগঞ্জের কায়স্থ গ্রামের এক কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়। তাকেও সৌদি আরব নেওয়ার কথা বলে ওই হোটেলে নেওয়া হয়েছিল। পরে আটক তিনজনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সিআইডি পুলিশ গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে 'গৃহপরিচারিকা'র কাজের উদ্দেশে যাওয়া ওই তরুণীকে উদ্ধার করে। এ সময় সৌদি আরবে এক দালালকেও আটক করা হয়।

ঢাকা থেকে উদ্ধার কিশোরী ও আটক তিনজনকে বৃহস্পতিবার বিকেলে হবিগঞ্জের আদালতে হাজির করা হয়। উদ্ধার কিশোরী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত সুলতানার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

সৌদি আরব থেকে তরুণীর আধা ঘণ্টাব্যাপী মোবাইল ফোনের কথাবার্তা ও আত্মীয়স্বজন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার গ্রিন বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে গৃহপরিচারিকার কাজ নিয়ে তিনি সৌদি আরবের দাম্মামে যান। কিন্তু তাকে গৃহপরিচারিকার কাজ দেওয়া হয়নি। হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানের ১৯ নারীর সঙ্গে তাকে বন্দি করে রাখা হয়। সেখানকার দালাল তাদের তিন-চারদিনের জন্য একেকজন সৌদি নাগরিকের কাছে পাঠায়। এরপর শুরু হয় তাদের ওপর শারীরিক ও পাশবিক নির্যাতন। সেখানে তাদের উপার্জিত অর্থও দালালরা নিয়ে যায়। কেউ কোনো প্রতিবাদ জানালে তাকে কিল-ঘুষি-লাথি মেরে আঘাত করা হয়।

তরুণীর পরিবার জানায়, সৌদি আরবে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছিল পাশের রাইয়াপুর গ্রামের শেকুল মিয়া নামে এক দালাল। তিনি মাসে ২০ হাজার টাকা বেতন, বছরে একবার দেশে আসার সুযোগ ও দুই ঈদ বোনাসের প্রলোভন দেয় তরুণীর পরিবারকে। প্রলোভনে রাজি হলে দালাল শেকুল ওই তরুণীর পাসপোর্ট করে তাকে ঢাকায় এক মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে সৌদি আরবে পাঠায়।

ওই তরুণী মোবাইল ফোনে তার বাবাকে বলেন, 'আব্বা আমাকে বাঁচাইবানি। আব্বা আমারে বাঁচাইলে শেকুলের বাড়ি যাও। ওরে বলো আমারে ফিরাইয়া আনতে। দুইদিনের মধ্যে যদি আমাকে দেশে না নিতে পারো তাহলে আমারে আর খুঁজে পাবে না। আমাকে দেশে না নিলে ফাঁস দিয়ে মরবো। একেক বাড়ি থেকে নিয়ে আমাদের রাখে ওদের অফিসে। ওটা একটা যমঘর। খাওন দেয় না। একটা রুটি ঢিল মারে। ওইটা খাইয়া থাকতে হয়।'

তরুণীর পরিবারের মামলায় দালাল শেকুল মিয়া ও গ্রিন বেঙ্গল ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির হোসেন পাটোয়ারীকে আসামি করা হয়।

হবিগঞ্জ-সিলেটের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী বলেন, গত সোমবার মেয়েটির বাবা-মা তার কাছে আসেন। টেলিফোনে রেকর্ড হওয়া মেয়েটির কথা শুনে তিনি আঁতকে উঠেন। তিনি হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্রের পরামর্শে ঢাকায় সিআইডির ডিআইজি শাহ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার পরামর্শে মঙ্গলবার নবীগঞ্জ থানায় মামলা করে মেয়েটির পরিবার।

এমপি কেয়া চৌধুরী জানান, তিনি বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, 'আমি বৃহস্পতিবার সংসদে এ নিয়ে কথা বলেছি। কেউ যেন না জেনেশুনে কোনো মেয়েকে বিদেশ না পাঠায় এ আহ্বান রেখেছি।'

এদিকে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উদ্ধার কিশোরী জানায়, কায়স্থ গ্রামের ইয়াকুব নামের এক দালাল তাকে গৃহপরিচারিকার কাজে সৌদি আরবে যেতে প্রলুব্ধ করে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি তাকে ঢাকায় নিয়ে যায় ইয়াকুব।

আটক পাচারকারী চক্রের তিন সদস্যকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে উদ্ধার কিশোরীকে তার বাবা-মায়ের জিম্মায় দেন আদালত।

এ ব্যাপারে সিলেট সিআইডি ব্র্যাঞ্চের এসআই সুমন মালাকার জানান, সৌদি আরবে পাচার ওই তরুণীকে দেশে ফেরাতে চেষ্টা ও দালালদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

আরও পড়ুন
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved