শিরোনাম
 ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধের নির্দেশ  এমপি রানাকে বিচারিক আদালতে হাজির করার নির্দেশ  অন্তিম শয়ানে নায়করাজ
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০১:৪১:০৪

দুর্নীতিগ্রস্ত ঠিকাদারই বিশ্বব্যাংকে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে

জাকির হোসেন

পদ্মা সেতুর নির্মাণ তদারকি পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কথিত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের কাছে চার ব্যক্তি অভিযোগ করেন। যারা অভিযোগ করেন তাদের মধ্যে অন্তত একজন দরপত্রে অংশগ্রহণকারী অসন্তুষ্ট কোনো ঠিকাদার বা তাদের লোক। অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্ট অব জাস্টিসের বিচারক জে নর্ডেইমার এ মামলার ওপর দেওয়া তার পর্যবেক্ষণে বিশ্বব্যাংকের কাছে অভিযোগকারী এক ব্যক্তি সম্পর্কে এ মন্তব্য করেন। এদিকে অভিযোগকারী ওই ব্যক্তি নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত বলে কানাডা পুলিশকে জানিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। পুলিশ এ তথ্য আদালতকে জানায়। বিশ্বস্ত সূত্রে এসব খবর জানা গেছে।

গত ৬ জানুয়ারি পদ্মা সেতু মামলার ওপর বিচারকের দেওয়া সিদ্ধান্তের পর গত ১০ ফেব্রুয়ারি আদালত এ মামলার তিন আসামিকে অব্যাহতি দেন। ফলে পদ্মা সেতুর দুর্নীতি মামলাটি বাতিল হয়ে যায়। ব্যক্তিগত যোগাযোগের নথিপত্র জব্দ করার যথেষ্ট ভিত্তি না থাকা এবং অহেতুক তথ্যানুসন্ধান থেকে মুক্ত থাকার নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে মামলায় উপস্থাপিত প্রমাণাদি বিচার প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন বিচারক জে নর্ডেইমার ।

আদালতের নথিতে বলা হয়, পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগের জন্য মূল্যায়ন কমিটি তাদের প্রতিবেদন ২০১০ সালের ডিসেম্বরে কারিগরি যোগ্যতার ক্ষেত্রে পাঁচ প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা করে। এতে প্রথম হয় যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠান এইচপিআর। দ্বিতীয় হয় কানাডার এসএনসি-লাভালিন। এর পরে থাকে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ডের এইকম, যুক্তরাজ্যের হ্যালক্রো ও জাপানের ওরিয়েন্টাল। দ্বিতীয় পর্যায়ে আর্থিক প্রস্তাবের ভিত্তিতে যে তালিকা হয় তাতে প্রথম হয় হ্যালক্রো। এসএনসি-লাভালিন এখানেও দ্বিতীয় নম্বরে থাকে। এইচপিআর চলে যায় তিন নম্বরে।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতিবিরোধী ইউনিটের (আইএনটি) কাছে ই-মেইলে চার ব্যক্তি অভিযোগ করেন যে, পদ্মা সেতুর কাজ পেতে কানাডার প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিন দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে। এর সূত্র ধরে ২০১১ সালের মার্চে

আইএনটির তদন্ত কর্মকর্তা পল হেইন্স কানাডার রয়্যাল মাউন্টেড পুলিশকে (আরসিএমপি) বিষয়টি জানান। হেইন্স অভিযোগকারী প্রথম ও তৃতীয় ব্যক্তির পরিচয় জানতেন না। দ্বিতীয় ব্যক্তির পরিচয় জানতেন, তবে ওই ব্যক্তির অনুরোধে পুলিশকে তার পরিচয় জানাননি। চতুর্থ ব্যক্তির পরিচয় হেইন্স জানতেন এবং পুলিশকেও জানিয়েছিলেন। চতুর্থ ব্যক্তির দেওয়া তথ্য ছিল খুবই সাধারণ এবং মূল অভিযোগের সঙ্গে সঙ্গতিহীন। অভিযোগকারীদের কেউই কানাডা পুলিশকে কোনো তথ্য দেননি। পুলিশ এক ও তিন নম্বর ব্যক্তির সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি। দ্বিতীয় ব্যক্তির সঙ্গে পুলিশ শুধু ফোনে কথা বলে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যক্তি যেসব তথ্য দেয় তার বেশিরভাগই অন্য সূত্র থেকে পাওয়া। পুলিশ এসব সূত্রের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি। প্রথম ব্যক্তির তথ্য ছিল গুজবনির্ভর। যেমন_ তার একটি ডকুমেন্টে বলা হয়েছে, 'দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির গুজব আমরা শুনেছি। সর্বশেষ গুজবের ভিত্তি আছে, যা আমরা এখনও দেখিনি। যদি এই গুজব সত্য হয়, তার মানে এর মূল্যায়ন সঠিক হয়নি।'

আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, পুলিশ দ্বিতীয় তথ্যদাতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কোনো তদন্ত করেনি। তিনি যেসব তথ্য দিয়েছেন তা অন্য কোনো সূত্র থেকে পাওয়া। বিশ্বব্যাংক পুলিশকে জানিয়েছিল, দ্বিতীয় ব্যক্তি আগেই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তা পদ্মা সেতুর দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে ওই ব্যক্তি কাজ পেতে এই দুর্নীতি করেছিলেন কি-না তা আদালতের নথিতে উল্লেখ নেই।

এদিকে পুলিশের অভিযোগে বলা হয়, এসএনসির তিন কর্মকর্তা রমেশ শাহ, কেভিন ওয়ালেস ও ইসমাইল দুবাই গিয়ে ঘুষের লেনদেন নিয়ে বৈঠক করেছেন। তবে পুলিশ তাদের দুবাই যাওয়ার সপক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। আবার অভিযোগকারী চার ব্যক্তির একজন জানান, এসএনসির ওই তিন কর্মকর্তা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে গভীরভাবে যোগাযোগ রাখেন এবং তারা পদ্মা সেতুর পাঁচ কোটি ডলারের কাজ পেতে এরই মধ্যে ১০ লাখ ডলার খরচ করেছেন। আদালত এ বিষয়ে বলেছেন, এগুলো অভিযোগ মাত্র, এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, দ্বিতীয় অভিযোগকারীকে বিশ্বব্যাংকের আইএনটি এবং কানাডা পুলিশ এই মর্মে 'বিশ্বাসযোগ্য' বলেছে যে, অভিযোগকারী যে সূত্র থেকে দুর্নীতির তথ্য পেয়েছে ওই সূত্রকে 'বিশ্বাসযোগ্য' মনে করেন। যার পরিচয় গোপন (সূত্র) রয়েছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে এ যুক্তিকে গ্রহণ করেননি আদালত। ওই অভিযোগকারী জানান, দুবাইয়ে ঘুষের লেনদেনের বিষয়টি একজন বিদেশি কর্মকর্তা একজনকে বলেছেন এবং তিনি (অভিযোগকারী) সেই একজনের কাছ থেকে শুনেছেন। দুবাইতে কথিত বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের একজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন বলেও গুজব শোনেন অভিযোগকারী। আদালতে এসবের সপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি পুলিশ।

আদালত মনে করেন, কোনো ঠিকাদার এসএনসি-লাভালিনের নামে দুর্নাম রটাতে এ অভিযোগ আনে। যদিও পুলিশ যুক্তি দেয়, এসএনসি-লাভালিন দরপত্র মূল্যায়নে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। প্রথম ছিল যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠান হ্যালক্রো। এসএনসি-লাভালিন ওই কাজ পাবে তা মনে করার কারণ নেই। তাহলে কেন অন্য ঠিকাদার এসএনসির দুর্নাম করবে? এ বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ হলো, এ যুক্তি সঠিক নয়। কেননা যদি হ্যালক্রোর দরপত্রে কোনো মৌলিক খুঁত থাকে তাহলে এসএনসির প্রথম হওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে অন্য কোনো ঠিকাদার এসএনসি যাতে কাজ না পায় তার জন্য এই অভিযোগ সাজাতে পারে। আদালতের পর্যবেক্ষণে একাধিকবার বলা হয়েছে, অভিযোগকারীরা এই দরপত্রে অংশগ্রহণকারী অন্য কারও হয়ে কাজে করেছে।

আদালতের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, কথিত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের বিষয়ে মামলাটির কার্যক্রম চলার এক পর্যায়ে ১৯৯০ সালের একটি মামলার রায়ের উদাহরণ তুলে ধরে কানাডা পুলিশ কর্তৃক তাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্যাদি জব্দ করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আবেদন করেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ৬ জানুয়ারি রুলিংটি দেন। রুলিং দেওয়ার পর এটিকে প্রকাশনা নিষিদ্ধের আওতায় রাখা হয়। গত ১০ ফেব্রুয়ারি এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

বিচারক জে নর্ডেইমার তার রুলিংয়ের উপসংহারে বলেন, ২০১১ সালে ২৪ মে, ১১ জুন এবং ৮ আগস্ট আদালত অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত যোগাযোগের নথিপত্র জব্দ করার যে অনুমোদন দিয়েছিলেন তাতে আইনি ভিত্তির ঘাটতি আছে। আর এই অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে অযৌক্তিক তথ্যানুসন্ধান থেকে মুক্ত থাকার চার্টার অব রাইটসের ৮ অনুচ্ছেদে দেওয়া অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ কারণে অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত যোগযোগের নথিপত্রকে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হলো।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved