শিরোনাম
 লংগদুতে যৌথবাহিনীর অভিযানে একে-৪৭ রাইফেল-গুলি উদ্ধার  গাবতলীর পশুরহাটে ভয়াবহ আগুন  সিরাজগঞ্জে বাস- মাইক্রো সংঘর্ষে নিহত ৪  নতুন ভ্যাট আইন ২ বছর স্থগিত
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০১:৩৬:২১ | আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০৯:৫৯:৫০

মরেও শান্তি পেল না কিশোরী লিম্পা

লাশ নিয়ে হাসপাতালের অমানবিক টানাহেঁচড়া
সাহাদাত হোসেন পরশ

জরাজীর্ণ টিনের একটি খুপরি ঘর। আসবাব বলতে রয়েছে ভাঙাচোরা একটি খাট, আলমারি ও পড়ার টেবিল। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু বই। একপাশে একটি পুরনো কম্পিউটার ও চকোলেট। রাজধানীর মিরপুরের কালাপানি এলাকার বেগুনটিলার বস্তির ঘরটিতে এমন পরিবেশে বসবাস করে জান্নাতুল ফেরদৌস লিম্পার (১৪) পরিবার। গতকাল বৃহস্পতিবার ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বিলাপ করে কান্না করছেন লিম্পার মা ফাহিমা বেগম। তার শাড়ির আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে সাত-আট বছরের একটি কন্যাশিশু। কোলে পাঁচ মাসের আরেকটি সন্তান। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন প্রতিবেশীরা। মেয়েকে হারিয়ে ফাহিমা বলছিলেন, 'গরিবের আন্ধার ঘরের আলো ওরা কেড়ে নিল। লেখাপড়া করে লিম্পা অনেক বড় হতে চেয়েছিল। অপারেশনে হাত সোজা করতে

গিয়ে মেয়ের প্রাণ ছিনিয়ে নিয়েছে ওরা।' পল্লবীর রিজেন্ট হাসপাতালে গত মঙ্গলবার অপারেশন করার আগে ভুয়া চিকিৎসক ফারুক হোসেন অ্যানেসথেসিয়া দেন লিম্পাকে। ওই অ্যানেসথেসিয়াতেই না-ফেরার দেশে চলে যায় লিম্পা।

লিম্পার স্বজন ও পুলিশ বলছে, ও রিজেন্ট হাসপাতালে মারা গেলেও তার চিকিৎসার কথা বলে অ্যাম্বুলেন্সে একাধিক হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘোরানো হয়। চরম নির্দয় এ বিষয়টি স্বজনের কাছে গোপন করে রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মহাখালীর মেট্রোপলিটান হাসপাতাল থেকে দেওয়া প্রতিবেদনেও বলা হয়, ওই হাসপাতালে পেঁৗছার আগেই লিম্পা মারা গেছে।

লিম্পার মৃত্যুর ঘটনায় ভুয়া অ্যানেসথিয়াসিস্ট ফারুক হোসেন, চিকিৎসকের সহকারী সাইফুল ইসলাম, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজবাউল আলম মিল্টন ও চিকিৎসক নাসির উদ্দিনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের বাবা জয়নাল শেখ। ভুয়া চিকিৎসক ফারুককে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হলেও অন্যদের এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

লিম্পা স্থানীয় নাহার একাডেমিতে নবম শ্রেণিতে পড়ত। তিন ভাইবোনের মধ্যে সে বড়। তাদের গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের নিশ্চিন্তপুরে। লিম্পার বাবা মাংসের চর্বি কেনাবেচার একটি প্রতিষ্ঠানে ছোটখাটো চাকরি করেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) দাদন ফকির সমকালকে বলেন, রিজেন্ট হাসপাতালেই লিম্পা মারা গেছে। এরপরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃত লিমাকে অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলে পথে পথে ঘোরায়। জঘন্য এই প্রতারণায় জড়িত একজনকে এরই মধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক রফিকুল ইসলাম বলেন, লিম্পার মৃত্যুর ঘটনায় মহাখালী মেট্রোপলিটান হাসপাতাল থেকে যে সনদ দেওয়া হয়েছে তাতে বলা হয়, ওই হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পেঁৗছার আগেই লিম্পা মারা গিয়েছিল।

এ ব্যাপারে রিজেন্ট হাসপাতালের পরিচালক মো. খলিলুর রহমান সমকালকে বলেন, ২০১৬ সালের আগস্টে রিজেন্ট হাসপাতালের মিরপুর শাখা চালু হয়। মাসখানেক পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে রিজেন্ট হাসপাতালে চাকরি নেন ফারুক হোসেন। লিম্পার ঘটনার মধ্য দিয়ে জানা গেল, চিকিৎসাশাস্ত্রে তার কোনো পড়াশোনা নেই। এই ভয়ঙ্কর সত্য জেনে আমরাও হতবাক।

ঋণ করে অপারেশনের টাকা জোগাড় :লিম্পার মা ফাহিমা জানান, পরিচিত সাইফুলের প্ররোচনায় মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশনের ১৪/১১ নম্বর মিতার প্লাজার চতুর্থ তলায় রিজেন্ট হাসপাতালে লিম্পাকে অপারেশনের জন্য নেওয়া হয়। সাইফুল ওই হাসপাতালের দালাল হিসেবে কাজ করে। লিম্পার বাবার সঙ্গে হাত সোজা করার অপারেশনের জন্য ৫৫ হাজার টাকার চুক্তি হয়। টাকা জোগাড় করতে না পারায় একাধিক দফায় অপারেশনের দিনক্ষণ পেছানো হয়। শেষে লিম্পার বাবা তার বন্ধু জাকিরের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে অপারেশনের ব্যবস্থা করেন। এর আগে মেয়ে বায়না ধরেছিল, একটি কম্পিউটার কিনে দিতে হবে। মৃত্যুর তিন দিন আগে একটি পুরনো কম্পিউটারও লিম্পাকে কিনে দেওয়া হয়েছিল। মেয়ে নেই; এখন এই কম্পিউটার কে চালাবে!

মৃত লিম্পাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া :হতভাগ্য কিশোরীর বাবা জয়নাল শেখ জানান, গত মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেন। ঘণ্টা দুয়েক পর চিকিৎসকরা জানান, লিম্পার অবস্থা খারাপ। মূল অপারেশন শুরুর আগে আড়াইটার দিকে লিম্পাকে অ্যানেসথেসিয়া দেন ফারুক হোসেন। আবার বিকেল ৩টার দিকে তার শরীরে ইনজেকশন পুশ করা হয়। এর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, লিম্পার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। তাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাড়া করা একটি অ্যাম্বুলেন্সে ওই দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে লিম্পাকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পেঁৗছে সিট পাওয়া যায়নি। এর পর রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লিম্পাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। অ্যাম্বুলেন্স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পেঁৗছালে রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে, 'ঢাকা মেডিকেলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। দ্রুত মহাখালী মেট্রোপলিটান হাসপাতালে যেন তাকে নিয়ে যাওয়া হয়।' এর পর অ্যাম্বুলেন্স ঘুরিয়ে মহাখালীর দিকে যাত্রা শুরু করে। শাহবাগ আসার পর অ্যাম্বুলেন্স যানজটে আটকা পড়ে। এ সময় যানজট ছাড়ানোর কথা বলে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে রিজেন্ট হাসপাতালের প্রতিনিধি আরিফুল পালিয়ে যান। তার সঙ্গে নিয়ে যান লিম্পার চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব কাগজ। ওই দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে মেট্রোপলিটান হাসপাতালে লিম্পাকে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। লিম্পার বাবার অভিযোগ, রিজেন্ট হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর সময় লিম্পার হাত-পা ঠাণ্ডা ছিল। ও আগেই মারা গেছে। তাদের ধোঁকা দিয়ে রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরিয়েছে। লিম্পার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানার কারণে অ্যাম্বুলেন্স থেকে পালিয়ে যান রিজেন্ট হাসপাতালের কর্মচারী।

এ ব্যাপারে রিজেন্ট হাসপাতালের পরিচালক খলিলুর রহমান বললেন, অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর তার জ্ঞান না ফেরায় অন্যত্র স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ পাওয়া যাবে না_ এমন আশঙ্কায় মহাখালীর মেট্রোপলিটান হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। হয়তো রাস্তায় যানজটে আটকে পড়ে হাসপাতালে পেঁৗছার আগেই লিম্পা মারা যায়।

চিকিৎসার নামে ফারুকের প্রতারণার ফাঁদ :মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভুয়া অ্যানেসথিয়াসিস্ট ফারুক দীর্ঘদিন ধরে বিএসএমএমইউর কনসালট্যান্টের পরিচয়পত্র তৈরি করে মিরপুরের বিভিন্ন হাসপাতালে 'অন কলে' অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে আসছিলেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে তার কোনো বৈধ সনদ নেই।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved