শিরোনাম
 ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধের নির্দেশ  এমপি রানাকে বিচারিক আদালতে হাজির করার নির্দেশ  অন্তিম শয়ানে নায়করাজ
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

প্রদোষে প্রদ্যোত

গোলাম মুরশিদ
যে যুগে শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে গেছে, অধ্যাপনার সঙ্গে পাণ্ডিত্যের যোগাযোগ বলতে গেলে লুপ্ত, সেই সংকটকালে এখনও যে স্বল্পসংখ্যক শ্রদ্ধাভাজন মনীষী প্রায় অন্ধকার শিক্ষাঙ্গনে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো অকাতরে আলোক বিতরণ করছেন, তাদের একজন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। আমি তার একেবারে পেছনের কাতারের একজন ছাত্র। তার পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু মানুষ হিসেবে তাকে আমি যেমনটা দেখেছি, সেটা বলা হয়তো অসম্ভব নয়।

আত্মবিশ্বাসের অভাব আর মিশতে পারার অক্ষমতা- এই দুই কারণে সবার পেছনে আমি লুকিয়ে থেকেছি চিরদিন। এতে আমার আগাগোড়াই ক্ষতি হয়েছে, তবে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে ছাত্রজীবনে। শিক্ষকদের কাছাকাছি যেতে পারিনি। যে সাহায্য এবং শিক্ষা তাদের কাছ থেকে পাওয়ার সুযোগ এসেছিল, তার সদ্ব্যবহার করতে পারিনি পুরোপুরি। উল্টো প্রথম দিনেই শরীফ স্যারের ধমকে নিজের খোলসের মধ্যে আরও সেঁদিয়ে গিয়েছিলাম। সেই খোলস থেকে আমাকে খানিকটা টেনে বের করেছিলেন মুনীর স্যার আর আনিস স্যার। কিন্তু এদের দু'জনের মধ্যে মস্ত একটা পার্থক্য ছিল। মুনীর স্যারের থেকে আকর্ষণীয় করে পড়াতে আমি কাউকে দেখিনি। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথা গিলতাম। কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল নিতান্তই নৈর্ব্যক্তিক। যতদিন ছাত্র ছিলাম ক্লাসের বাইরে তার সঙ্গে কোনো দিন কথা হয়নি। শ্রেণিকক্ষের বাইরে বিভাগের একমাত্র শিক্ষক যার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তিনি আনিস স্যার। তিনি সেই অল্প বয়সেই ভালো ছাত্র এবং গবেষক হিসেবে প্রায় জীবিত কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু মুনীর স্যারের মতো তিনি ধরাছোঁয়ার একেবারে বাইরে ছিলেন না।

প্রতিভাবান লোকেরা বেশিরভাগই উৎকেন্দ্রিক হন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান খুবই প্রতিভাবান, কিন্তু আশ্চর্য, তিনি আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো- স্বাভাবিক। তার মতো এমন নিরহঙ্কার, নিজেকে জাহির না করা, বিনয়ী, মৃদুভাষী, ভদ্রলোক খুবই কম দেখেছি আমি। তার পাণ্ডিত্য আছে, কিন্তু পাণ্ডিত্যের সঙ্গে যুক্ত অসহিষ্ণুতা অথবা রুক্ষতা নেই। তার পাণ্ডিত্য সম্পর্কে আর একটা কথা না বলে পারিনে। বিশেষজ্ঞতার এই যুগে পাণ্ডিত্য ধারালো হয়, কিন্তু তা সীমাবদ্ধ থাকে সংকীর্ণ এলাকার মধ্যে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের পাণ্ডিত্য সে রকম নয়। তিনি বিচিত্র বিষয় নিয়ে ব্যাপক অধ্যয়ন করেছেন। একটি বেতারের জন্য আমি অনেক বার তার সাক্ষাৎকার নিয়েছি, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে। প্রতিবারেই লক্ষ্য করেছি, তিনি তথ্যপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। সেই সঙ্গে দিয়েছেন নিজের মৌলিক পর্যবেক্ষণ।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান গবেষণা শুরু করেছিলেন বাংল সাহিত্যে মুসলিম অবদান নিয়ে। এই প্রসঙ্গে তিনি মুসলিম মানসের যে ঐতিহাসিক পটভূমি অঙ্কন করেন এবং তার ব্যাখ্যা দেন, তা তখনও পর্যন্ত ছিল এ বিষয়ে সবচেয়ে মূল্যবান গবেষণা। ছাত্রজীবনে তার এই গবেষণার মূল্য বুঝতে পারিনি। কিন্তু পরে খানিকটা পেরেছিলাম। তার অভিসন্দর্ভ রচনা করতে গিয়ে তিনি যে সব মুসলিম-পরিচালিত পত্রপত্রিকা ব্যবহার করেছিলেন, তার অনেকগুলোর নামও অনেকের জানা ছিল না। সেগুলো ব্যবহার করা তো দূরের কথা। পরে এই পত্রপত্রিকার পরিচয় দিয়ে তিনি যে গ্রন্থটি রচনা করেন, সেটি খুবই মূল্যবান হয়েছিল অন্য গবেষকদের জন্য। আরও একটি অত্যন্ত মূল্যবান গবেষণা তিনি পরে লন্ডনে করেছিলেন, বাংলা গদ্য নিয়ে। এক সময় বাংলা গদ্যের ইতিহাস লেখা হতো ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে। কিন্তু যাদের গবেষণার ফলে এখন সে ইতিহাস শুরু হয় আরও আগে থেকে, তিনি তাদের অগ্রণী। ১৭৯০-এর দশকে তাঁতীদের লেখা চিঠি থেকে তিনি প্রাক-ফোর্ট উইলিয়াম কলেজি গদ্যের সন্ধান দেন। এই গদ্যের চেহারা এবং চরিত্র, পণ্ডিতী গদ্য থেকে আলাদা। এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তিনি যে গ্রন্থটি রচনা করেন, সেটি আকারে ছোট কিন্তু বাংলা গদ্য সম্পর্কিত গবেষণার দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের পাণ্ডিত্য সম্পর্কে বিস্ময়ের সঙ্গে যা লক্ষ্য করি, তা হলো : তিনি বেশিরভাগ পণ্ডিতের মতো সংক্ষিপ্ত পথে বিশ্বাস করেন না। বরং প্রতিটি বিষয়ের গভীরে যেতে পছন্দ করেন। তিনি যা লেখেন, অনায়াসে তার ওপর নির্ভর করা যায়। কারণ কোনো কিছু ভালো করে খতিয়ে না দেখে তিনি লেখেন না। সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কেও তিনি পুরোপুরি সচেতন। বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে যখনই কোনো বিতর্ক দেখা দিয়েছে, তিনি তখন বলিষ্ঠ অবস্থান নিতে পিছুপা হননি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমরা কেবল পালিয়ে বেঁচেছিলাম। কিন্তু তিনি মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যুক্ত থেকে সেই যুদ্ধে রীতিমতো একটা ভূমিকা পালন করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি সংবিধান লিখতে, পরিভাষা তৈরি করতে, সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রবর্তনে সাহায্য করার ব্যাপারে, আমার ধারণা, অন্য সবার থেকে বড় ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু পাণ্ডিত্য, গবেষণা, সামাজিক ভূমিকা ইত্যাদি চেয়েও যে কারণে আমি তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল তা হলো : তার ব্যক্তিত্ব। তার মতো এমন অমায়িক, মৃদুভাষী, অন্যের উপকার করতে সততপ্রস্তুত লোক আমি আর দেখেছি কি-না, সন্দেহ হয়। আমরা বন্ধুর প্রতিও সঙ্গীন উঁচিয়ে থাকি। তিনি শত্রুর প্রতিও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে থাকেন। এমন অজাতশত্রু এ যুগে বিরল।

যদ্দুর মনে পড়ে, অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সঙ্গে পরিচয় হয় ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সেই যোগাযোগ ক্রিকেট মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আমি পাস করে বের হওয়ার পর তা ধীরে ধীরে বেশ ঘনিষ্ঠ হয়। এবং সত্যি বলতে কী, দীর্ঘস্থায়ী এই সম্পর্ক থেকে আমি যত লাভবান হয়েছি, অন্য কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে তেমন হইনি। আমি ৪৫ বছর ধরে তার ছাত্রই থেকে গেছি। আপসোসের বিষয়, তিনি যত দিতে পারতেন, নিজের অক্ষমতার কারণে তার কাছ থেকে অতটা নিতে পারিনি।

পাস করে বের হওয়ার কয়েক বছর পরে প্রথম বই আমি লিখেছিলাম বৈষ্ণব পদাবলি নিয়ে। ছাপার আগে একমাত্র যাকে এই লেখাটি দেখিয়েছিলাম, তিনি আনিস স্যার। আমার লেখাটি যে বৈষ্ণব পদাবলি সম্পর্কে চিরাচরিত আলোচনার মতো নয়, অর্থাৎ ওটা যে কিছু হয়নি, এটা তিনি বলেছিলেন; কিন্তু বলেছিলেন নরম করে, উৎসাহ দিয়ে। শরীফ স্যার আমাকে খুবই স্নেহ করতেন; কিন্তু যে ঘণ্ট আমি তৈরি করেছিলাম, সেটা তিনি একদম সহ্য করতে পারেননি।

বৈষ্ণব পদাবলি সম্পর্কে আমার সেই প্রথম বই প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে আমি আরও অনেক আবর্জনা সৃষ্টি করেছি। অনেক নিরীহ বৃক্ষের পতনের কারণ হয়েছি। একমাত্র ইতিবাচক দিক- পোকাদের কাটার জন্য অকৃপণভাবে খাদ্য তৈরি করেছি। কিন্তু আমার প্রায় প্রতিটি প্রয়াসে আনিস স্যারের অকুণ্ঠ সাহায্য পেয়েছি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে কলকাতায় পালিয়ে গেছি। মাঝে মধ্যে 'আনন্দবাজার' আর 'দেশ'- এ লিখে সামান্য আয় করছি। কিন্তু লেখার মসলা তেমন ছিল না। যখনই দরকার হয়েছে, তখনই স্যারের কাছ থেকে তথ্য জোগাড় করে লিখেছি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বোধহয় কোনো কৈরানিক ত্রুটিবশত আমাকে বিদ্যাসাগর বক্তৃতামালা দেওয়ার জন নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল। সে বক্তৃতাও তাকে দেখিয়েছিলাম '৭৩ সালের গোড়ায়। যত্ন নিয়ে দেখেছিলেন। তার কয়েক বছর পরে আমি যখন একটি অভিসন্দর্ভ লিখি, তখনও তিনি নিজের খুব মূল্যবান সময় নষ্ট করে সেটি দেখে দিয়েছেন, সেই সঙ্গে দিয়েছেন এন্তার উৎসাহ। কয়েক বছর আগে আমি এক বাঙালি কবির একটি জীবনী লেখি। সেটিও দেখিয়েছি তাকে। তিনি বানান ভুল থেকে শুরু করে অনেক অসঙ্গতি দেখিয়ে দিয়েছেন। আমার ধারণা, এ রকমের সাহায্য তিনি অন্য ছাত্রদেরও করেছেন। কারণ সাহায্য করা, উপকার করা তার উদার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।

তার প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাই।
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved