শিরোনাম
 আদিলুরকে ফেরত পাঠাল মালয়েশিয়া   ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন  ভারতের নতুন রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ  আইনজীবী তালিকাভুক্তি পরীক্ষা শুক্রবার
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০১৬, ০০:৫৬:৩৩

তামিম যেতেই সব তাসের ঘর!

সঞ্জয় সাহা পিয়াল
শেষ বিকেলে এসে সকালকে মুখে শোনা গল্পের মতোই 'কাল্পনিক' মনে হচ্ছিল! কী ব্যাটিংটাই না করছিলেন দু'জনে। ফুৎকারে উড়ে যাচ্ছিলেন সব ইংলিশ বোলার। জ্যামিতিক ছকে পুরো মাঠ এফোঁড়-ওফোঁড় করে বাউন্ডারি তামিম-মুমিনুলের। গ্যালারি তখন ঝলমলে, ছুটির শুক্রবারে টেলিভিশন দর্শকদের মেজাজও ছিল বেশ ফুরফুরে। দুপুরের খাওয়া খেতে খেতেই কারও হিসাব ছিল তিনশ', কারও হিসাব চারশ' ছাপিয়ে! তামিম-মুমিনুলের ১৭০ রানের জুটিতে গোটা দেশ যেন সাক্ষাৎ বসন্ত! তার পরই হঠাৎ অন্ধকার। স্বপ্নগুলো সব তাসের ঘর! স্টোকস আর মইন টোকা দিতেই ৪৯ রানে ৯ উইকেট হাওয়া। কোনো কালোজাদুতে নয়, ব্যাটসম্যানদের খেয়ালিপনার সঙ্গে টেকনিক্যাল কিছু দুর্বলতায় বেরিয়ে পড়ে ভেতরের খাঁচা! ২২০ রানে অলআউট

বাংলাদেশ, নাটকের শেষ এখানেই নয়। ইংল্যান্ডও ৫০ রান তুলে খুইয়েছে ৩ উইকেট। মিরপুর টেস্টের ভাগ্যরেখায় প্রথম দিনই যে মোড় লুকিয়ে তা বুঝতে পারেনি কেউ। 'কে জানে কেন এমন হলো, এভাবে আমাদের ব্যাটিং অর্ডার ভেঙে পড়ার কোনো যুক্তি আমার জানা নেই।' ১০৪ রানের তৃপ্তি ছাপিয়ে দিন শেষে তামিমের চোখেমুখে অপার কৌতূহল।

যেখানে তিনি আর মুমিনুল মিলে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ইংলিশ বোলারদের কপালের ভাঁজ ফেলে দিয়েছিলেন। স্টোকসকে সপাটে বাউন্ডারিছাড়া করেছিলেন, মইন আলিকে তুলে আছড়ে মেরেছিলেন। সেই একই পিচে কীভাবে তার সতীর্থরা আত্মাহুতি দিতে পারেন এভাবে? তামিম একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন বটে, তবে তিনি নিজেই তাতে সন্তুষ্ট নন। শেষ দিকে স্টোকস রিভার্স সুইং পাচ্ছিলেন, মইনও টার্ন পাচ্ছিলেন। কিন্তু যেভাবে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ জায়গায় দাঁড়িয়ে স্টোকসের বাইরে দিয়ে যাওয়া বলে ব্যাট চালিয়ে ক্যাচ দিলেন, যেভাবে সাকিবও হাতখানেক দূরের বল বসে একই জায়গা থেকে ওকসকে ব্যাট ছুড়লেন, শুভাগত হোম যেভাবে একই ভঙ্গিতে ব্যাট চালিয়ে ক্যাচ দিলেন, যেভাবে সাবি্বর ব্যাট ছুঁয়ে পিছিয়ে এলেন_ তাতে কতটা রিভার্স সুইং ছিল! আসলে গতির বেয়াদবি কখনোই সহ্য করতে পারেন না আমাদের ব্যাটসম্যানরা। সেখানে কাল ওকস ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার গতিতেও বোলিং করেছিলেন। স্টোকস তো বাউন্সার দিয়ে মুশফিককে একবার ভূপাতিতই করলেন। বুকসমান উঠে আসা এসব বল খেলতে বরাবরই বিরক্ত হন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা। সেখানে তামিম সকালের দিকে দারুণ কিছু পুল হাঁকিয়ে ইংলিশ বোলারদের ছন্দ কেটে দিয়েছিলেন। মুমিনুলও সুইপ শটে ইংলিশ স্পিনারদের পত্রপাঠ বিদায় করেছিলেন।

সেইসঙ্গে তামিম ও মুমিনুল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিজেদের তৈরিও করে নিয়েছিলেন। সকালে ইমরুল যখন তৃতীয় ওভারেই ওকসের ওয়াইড বলটি জায়গায় দাঁড়িয়ে কাট করতে গিয়ে পয়েন্টে ক্যাচ তুলে দেন। তখন তামিম কিন্তু সতর্ক ছিলেন, এতটাই যে, প্রথম রানটি নিতে তাকে অপেক্ষা করতে হয় ১৯টি বল। এমনকি বাউন্ডারি হাঁকানোর জন্যও তাকে অপেক্ষায় থাকতে হয় একটি বাজে বলের। সেটা পেয়েছিলেন ৩৩টি বল ক্রিজে কাটানোর পর। বরং তামিমের তুলনায় মুমিনুল এসে গা ঝাড়া দেন। ওকসের স্টাম্প বরাবর বলটি ফ্লিক করেই সাহস জুগিয়ে নেন মুমিনুল। এরপর আর কাউকেই রেয়াত করতে হয়নি তাকে। তামিমও ওই ওকসের একটি ওভারেই তিন বাউন্ডারি হাঁকিয়ে বুঝে নেন, দিনটি তার জন্যই অপেক্ষা করছে। ইংল্যান্ড এমনিতেই তামিমের প্রিয় প্রতিপক্ষ, তার ওপর মিরপুরও তার প্রিয় ভেন্যু। সব মিলিয়ে যেন রাজযোটক ছিল তামিমের জন্য। ৪০ বলে যার রান ছিল ১৩, তিনিই কি-না ৫৩ বলে ৪৫ রানে পেঁৗছে যান মেজাজ সপ্তমে চড়িয়ে। অবশ্য পঞ্চাশ পাওয়ার পর কিছুটা দম নেন তামিম। ৫২ থেকে ১২৪ বল, মাঝের এই ৭২ বলে কোনো বাউন্ডারি ছিল না তার ব্যাটে। নিখুঁত ইনিংস খেলেই এরপর ক্যারিয়ারের অষ্টম সেঞ্চুরি পেয়ে যান। যার তিনটিই আবার এই ইংল্যান্ডের সঙ্গে। স্কোরবোর্ডে ১ উইকেটে ১১৮ রানে লাঞ্চে যায় বাংলাদেশ। এরপর তামিমের সেঞ্চুরি আর মুমিনুলের হাফ সেঞ্চুরিতে প্রথম ঘণ্টা বেশ ভালোয় ভালোয় চলছিল।

কিন্তু মিরপুরের আকাশের একদিকে জমে থাকা মেঘের মতোই বুঝি বা গজরাতে থাকেন তখন মইন আলি-স্টোকস। বলটি টার্ন করতে পারে_ চট্টগ্রাম টেস্টের ওই ভাবনা থেকেই মইনের সোজা আসা বলটি কোনো ধরনের খেলার চেষ্টা না করেই পা এগিয়ে দেন তামিম। যদি ওই বলটি খেলার চেষ্টা করতেন তাহলে হয়তো রিভিউতে 'নটআউট' থাকতে পারতেন। এর আগে যেমন ৬৬ রানে থাকার সময় আম্পায়ার ধর্মসেনা এলবিডবি্লউ আউট দেওয়ার পর রিভিউ নিয়ে রক্ষা পান তামিম, তার আগে ৪৭ রানের সময়ও যেমন একবার কুক রিভিউ নিয়েও ভাগ্য ফেরাতে পারেননি। এবার আর সেটা হয়নি, আইসিসির নতুন নিয়মে বল উইকেট বরাবর পিচ না করে স্টাম্পের কোনো একজায়গায় আঘাত করলেই 'আউট'। কিছুটা ক্লান্ত তামিম ওই ভুলটি করার পরই যেন জাদুমন্ত্রে ঘুরে যায় ম্যাচ। ব্যাটে বল লেগে মুমিনুল আউট হয়ে যান ৬৬ রান করে। এরপর ১৭১ থেকে ২২০ রান তুলতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়ে যান বাকিরা।

মাহমুদুল্লাহ এসে ছক্কা হাঁকিয়ে গা ঝাড়া দিলেও টেকনিক্যালি ভুলের কারণেই আউট হয়ে যান। হেলমেটে আঘাত লাগার পর মুশফিকও ভুল করেছিলেন এগিয়ে এসে মইনকে ফ্লিক করার চেষ্টা চালিয়ে। সাবি্বরও বুকসমান ধেয়ে আসা বলে অস্বস্তিতে ছিলেন। ব্যাটিং লাইনআপ লম্বা করার জন্য যাকে নেওয়া, সেই শুভাগতও তেড়েফুঁড়ে খেলতে গিয়ে সর্বনাশ ঢেকে আনেন। বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের পেস দুর্বলতা দেখে ইংলিশ অধিনায়ক অ্যালিস্টার কুক দুই স্লিপ, লেগ স্লিপ, গালি দিয়ে উইকেটের পেছনে জাল বিছিয়েছিলেন। তাতেই শেষ পর্যন্ত ধরা দেয় বাকি সব উইকেট। চট্টগ্রামের পর এই মিরপুরেও মইন আলি দখল করেন ৫ উইকেট, তার সঙ্গে সেই স্টোকস ও তার রিভার্স সুইং।

অপ্রত্যাশিতভাবে বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হয়ে যাওয়ার পর প্রত্যাশিত ইংলিশ উইকেটও শিকার করেন সাকিব আর মেহেদি। সাকিবের বলটি কিছুটা টার্ন করে বেরিয়ে যাওয়ার মুখেই খুঁজে পায় বেন ডাকেটের পা। এরপর মেহেদির স্টাম্প সোজা বল কুকের ভেতরের পায়ে লাগলেও আম্পায়ার ধর্মসেনা চুপ থাকেন, কিন্তু রিভিউয়েই বেরিয়ে আসে কুক আউট। মাঠে বৃষ্টি নামার আগে সর্বশেষ সাফল্য ধরা দেয় মেহেদির বলে ব্যালেন্সের উইকেটিও।

মাঠ থেকে হোটেলে ফেরার মুখে শেষের এই ঊনচলি্লশ মিনিটই যা একটু সান্ত্বনা দিয়েছিল মুশফিকদের। তবে তাতে আর আর যা-ই হোক ৯ উইকেটে ঊনপঞ্চাশ তোলার দুঃখটা অন্তত ভোলানো যায়নি।
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved