শিরোনাম
 ভাস্কর্য সরানোর বিক্ষোভে টিয়ার শেল, আটক ৪  বাসের ধাক্কায় জাবির দুই শিক্ষার্থী নিহত  খুলনায় বিএনপি নেতা হত্যার প্রতিবাদে শনিবার হরতালের ডাক   সরানো হলো সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০১৬, ০০:৫০:৪৬

ইসি নিয়ে বাড়ছে উত্তাপ

পুনর্গঠন পদ্ধতি নির্ধারণে নানা মত
মসিউর রহমান খান
নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের পদ্ধতি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ইসি গঠনের দাবি তুলেছে। বিশিষ্টজনের মতে, সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী কমিশন গঠনে নতুন আইন প্রণয়নের বিকল্প নেই। সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে ইসি গঠনের প্রক্রিয়া আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলেও মনে করছেন তারা।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে_ আগেরবারের মতোই সার্চ কমিটির মাধ্যমে ইসি গঠন হবে। এর বাইরে অন্য কোনো পন্থা আপাতত পরিকল্পনায় নেই। আগামী বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তারা পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠিত এই ইসি নিয়ে দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক দেখা দেয়। এই কমিশনের আমলে অনুষ্ঠিত বেশ কিছু নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের পক্ষ থেকেও বর্তমান কমিশনের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এদিকে পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনকারী রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে ইসি গঠনের বিষয়ে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার দাবি জানালেও নতুন আইন প্রণয়নের বিষয়ে তাদের জোরালো কোনো অবস্থান নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে 'আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে' রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্বাচন কমিশনে কমিশনার নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এর আগে প্রায় সব ইসি গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। তাই এই

বিতর্ক এড়াতে প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান। একটি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরনণ করলেই এই বিতর্ক এড়ানো সম্ভব হতে পারে।

এতে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে যাকে খুশি তাকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগও বন্ধ হবে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের একাধিক সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, নতুন ইসি গঠন নিয়ে তারা কোনো মতামত বা সুপারিশ করবেন না। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আবু হাফিজ বলেন, নতুন ইসি কারা হবেন, কোন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হবে_ সেটা সরকারের বিষয়। এ জন্য সংসদ রয়েছে। সরকার সেখানে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

স্বাধীন বাংলাদেশে মাত্র দুই বার দুই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিইসি ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক সরকারের সময় আলোচনার মধ্য দিয়ে নিয়োগের বিষয়টি ছিল উপেক্ষিত।

প্যানেল তৈরিতে সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাব :বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের আমলে দেশের নির্বাচনী আইনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। ওই সময়ে ইসি গঠন নিয়েও একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়। যদিও পরে ওই প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। ২০১১ সালের ২৯ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধন হয়। এতে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অনধিক চার নির্বাচন কমিশনার নিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠনের বিধানযুক্ত হয়। এর আগে কমিশনের সদস্য সংখ্যা নির্দিষ্ট ছিল না।

শামসুল হুদা কমিশনের ওই প্রস্তাবের সার্চ কমিটিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান, সরকারি কর্মকমিশন চেয়ারম্যান ও মহাহিসাব নিরীক্ষকসহ বিদায়ী সিইসিকে রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল। এতে একজন নারী সদস্যকে রাখারও প্রস্তাব করা হয়। সংবিধানের সঙ্গে সমন্বয় রেখে 'দি ইলেকশন কমিশনারস (মেথড অব রিত্রুক্রটমেন্ট) অর্ডিন্যান্স' নামে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে কমিশনারদের পদ শূন্য হওয়ার কমপক্ষে এক মাস আগে সিইসিকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের সার্চ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছিল। এছাড়াও কমিশন থেকে আকস্মিকভাবে কেউ পদত্যাগ করলে বা সরানো হলে সঙ্গে সঙ্গে সার্চ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়।

নির্বাচন কমিশনের আইন কর্মকর্তারা জানান, সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে সংবিধানে বা দেশের প্রচলিত আইনে কোনো যোগ্যতা-অযোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়নি। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হয়েছে। এ এখতিয়ার প্রয়োগে রাষ্ট্রপতি স্বাধীন নন। সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে এ নিয়োগ দিতে হয়। যোগ্যতার শর্তাবলি না থাকায় যে কোনো ব্যক্তিকে এ পদে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একবার নিয়োগ পেলে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ ছাড়া তাকে অপসারণের আইনগত কোনো সুযোগও নেই।

ওই প্রস্তাবে কমিশনে নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে কতিপয় অযোগ্যতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। এরমধ্যে রয়েছে, ৬৫ বছরের বেশি বয়স, শিক্ষাগত জীবনে কোনো পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগ পাওয়া, আয়ের সঙ্গে জীবন-যাপন ব্যয়ের অসঙ্গতি, গণমাধ্যমে ও জনগণের কাছে বিতর্কিত, কোনো রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে সম্পৃক্ততা, আধা-রাজনৈতিক বা পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, নৈতিক স্খলন বা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত, সরকারি চাকরি থেকে বহিষ্কৃত বা বাধ্যতামূলক অবসর, ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপি।

বিশিষ্টজনের ভাবনা :সাবেক সিইসি ড. শামসুল হুদা বলেন, অনেক দেশে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পরামর্শ করে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়ে থাকে। এটি একটি ভালো কৌশল। আমরা কমিশনার নিয়োগ আইনের যে খসড়া তৈরি করে সরকারের কাছে দিয়েছিলাম, সেখানে এ প্রস্তাব ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর মত নিয়ে কমিশন গঠন করা হলে জনগণের আস্থা তৈরি হবে। সাবেক সিইসি আরও বলেন, নিরপেক্ষ ও আস্থাযোগ্য কমিশন গঠন করতে হলে একটি পদ্ধতি বের করতে হবে। সেটা করা সম্ভব হলে ইসির ওপর জনগণের আস্থা তৈরি হবে।

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক মনে করেন, সংবিধানের আলোকে একটি আইন প্রণয়ন ছাড়া ইসি গঠিত হলে তা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তাই এ অবস্থায় ভবিষ্যতে কমিশনার হিসেবে যারা শপথ নেবেন তারা আইনি ঝামেলায় পড়তে পারেন। তার মতে, গত ৪৪ বছর সংবিধানের এই নির্দেশনা মানা হয়নি বলে, এবার পার পাওয়া যাবে না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, অতীতে সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও বর্তমানে দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বর্তমান ইসি সঠিকভাবে কাজ করেনি বা করতে পারেনি। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য স্বাধীন ইসি ও সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে একটি আইন প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা থাকলেও গত ৪৪ বছরেও তা মানা হয়নি। আইন প্রণয়ন না করে নিয়োগ দেওয়া হলে এবার তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। অতীতে সঠিক পদ্ধতিতে কমিশনার নিয়োগ না দেওয়ার কারণে স্বাধীন হলেও কমিশনের সদস্যরা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি।

আবারও 'সার্চ কমিটি' :পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন নিয়োগে আগেরবারের মতো 'সার্চ কমিটি'র মাধ্যমে নতুন ইসি আসছে বলেই জানা গেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ইসি নিয়োগের প্রক্রিয়া আগের মতোই বহাল থাকছে। সরকারের একই অবস্থানের কথা জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, এবারও আগের প্রক্রিয়ায় ইসি নিয়োগ হবে। ২০১২ সালে যেভাবে বর্তমান ইসি গঠন করা হয়েছিল, এবারও সেভাবেই হবে। সংবিধানের আলোকে আইন প্রণয়নের বিষয়টি এখনও সরকারের বিবেচনায় আসেনি, আপাতত পরিকল্পনাও নেই।

সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্রপতি সব সময় সিইসি ও ইসি নিয়োগ দিলেও ২০১২ সালে সর্বশেষ কমিশন গঠিত হয় সার্চ কমিটির মাধ্যমে। ওই সময়ে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নামের সুপারিশ তৈরি করতে চার সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারককে সভাপতি করে গঠিত কমিটিতে সদস্য হন হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং সরকারি কর্মকমিশন চেয়ারম্যান। এর আগে বিএনপিসহ ২৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বঙ্গভবনে সংলাপে বসেন জিল্লুর রহমান। ওই সংলাপেও অধিকাংশ দলই সংবিধান অনুসারে সিইসি ও ইসি নিয়োগে পৃথক আইন প্রণয়নের পক্ষে মত দেয়।

সার্চ কমিটির আহ্বানে আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি দল নতুন কমিশনের জন্য তাদের পছন্দের ব্যক্তির নামের তালিকা দিলেও বিএনপি থেকে কোনো নাম দেয়নি। রাষ্ট্রপতির আদেশের পর ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সিইসি ও চার নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। পরদিন প্রধান বিচারপতির কাছে শপথ নিয়ে তারা যোগ দেন ইসিতে।

এর আগে দায়িত্বে ছিলেন যারা :ইসি কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে ১১ জন সিইসি ও ২৩ নির্বাচন কমিশনার এ পর্যন্ত নিয়োগ পেয়েছেন। এরমধ্যে সামরিক শাসনামলে একজন সিইসির মেয়াদ বাড়ানোর ঘটনা ঘটেছে মাত্র একবার। দেশের প্রথম সিইসি ছিলেন মো. ইদ্রিসের পাঁচ বছর মেয়াদ ১৯৭৭ সালের ৭ জুলাই শেষ হলে পরদিনই নিয়োগ পান বিচারপতি এ কে এম নুরুল ইসলাম। এরশাদের শাসনামলে তিনি প্রায় আট বছর সিইসি ছিলেন। ১৯৮৫ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারি নুরুল ইসলামের মেয়াদ শেষের দিনে নিয়োগ পান বিচারপতি চৌধুরী এ টি এম মাসুদ।

বিচারপতি সুলতান হোসেন খান ১৯৯০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সিইসি হন। এরশাদ শাসনামলে তিনি ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সিইসি ছিলেন। এরপর বিচারপতি আবদুর রউফ, বিচারপতি এ কে এম সাদেক, মোহাম্মদ আবু হেনা, এম এ সাঈদ ও বিচারপতি এম এ আজিজ। এম এ আজিজের বিরুদ্ধে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ অন্যরা রাজপথে আন্দোলনে নামেন। এক পর্যায়ে তিনি বিদায় নেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় কয়েক দফায় নিয়োগ পেয়ে একসঙ্গে সাতজন কমিশনার দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের সবাই একযোগে পদত্যাগ করেন। এরপর ড. শামসুল হুদা সিইসি হিসেবে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণ করলে বর্তমান কমিশন গঠিত হয়।
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved