logo
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০২:১৫
বুড়িগঙ্গা উদ্ধারে আশু করণীয়
রাজধানী
মো. আলাউদ্দিন
বুড়িগঙ্গা নদী ঢাকা মহানগরীর প্রাণপ্রবাহ। কিন্তু এ নদী আজ বিপন্ন। এ নদীর কাছে গেলে বা পত্রিকায় নদীর দুরবস্থা এ বিষয়ে পড়লে যে কোনো মানুষের মন কেঁদে ওঠে। বুড়িগঙ্গা নদী উদ্ধারে বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু প্রায় একযুগ পেরিয়ে গেল, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। উদ্ধারের নামে বহুমুখী প্রকল্প হয়েছে, অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি গণমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক প্রচার হচ্ছে। কিছু কাজও যে হয়নি, সেটা বলা যাবে না। কিন্তু বুড়িগঙ্গা অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ আগে যেমন ছিল, এখনও তেমনি আছে। এ নদীতে কেউ নামতে পারে না। এমনকি পাশ দিয়েও চলা যায় না। বুড়িগঙ্গা নদীর পুনরুদ্ধার, দূষণমুক্ত করা, পানির প্রবাহ, জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ পেয়েছে। বর্তমান সরকারের গোড়া থেকেই বুড়িগঙ্গা উদ্ধারের দৃশ্যমান কার্যাবলি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এ উদ্দেশ্যে কয়েকটি কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটিগুলো কাজ করছে। প্রকল্প গ্রহণের বিষয়েও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মেঘে মেঘে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে অনেক। বুড়িগঙ্গাকে অনতিবিলম্বে অপদখল ও দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে না পারলে বিলুপ্ত হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে ঢাকাবাসীর দূষিত বায়ু পরিবেশে বসবাস অনিবার্য হয়ে পড়বে। পরিণাম কতই না ভয়াবহ। এ বিষয়ে ফুটপাতের টোকাই থেকে দেশের সবাই, বিশেষ করে ঢাকার সব বাসিন্দা পদে পদে টের পাচ্ছে। হাতে সময় নেই। আজই বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হবে। তার জন্য অতি সংক্ষেপে আমরা নিজেদের অবস্থান থেকে যে কাজগুলো করতে পারি বা করা যায় তা দয়া করে দেখুন। কী করবেন? পানি উন্নয়ন বোর্ড :বুড়িগঙ্গার দু'পাশে নদী রক্ষা বাঁধ যতটুকু নির্মিত আছে তা বেদখল ও দূষণমুক্ত রাখার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যক্রম গ্রহণ করবে। এর মধ্যে নদীর তীরে অবৈধ কাঠামো আছে, সেগুলো উচ্ছেদের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড বাদী হয়ে জেলা প্রশাসন, ঢাকার সঙ্গে সমন্বয় করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করবে। বিআইডবি্লউটিএ :ঢাকা নৌবন্দর সীমার মধ্যে বুড়িগঙ্গা যে পরিমাণ তীরভূমি পড়েছে তা থেকে অবৈধ বাজার-হোটেল-প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করতে হবে। বিআইডবি্লউটিএর লিজকৃত একটি দোকান বা বাজার বা ঘাটে অস্থায়ী দোকানও রাখা যাবে না। বিআইডবি্লউটিএর কর্তৃত্বে সব ধরনের উচ্ছেদ অভিযানে বিআইডবি্লউটিএ উদ্যোগ নেবে। পরিবেশ অধিদপ্তর :বুড়িগঙ্গা এপার-ওপারে সব ধরনের শিল্প-কারখানার বর্জ্য পদার্থ পরিশোধন করে নদীতে ফেলার অত্যাবশ্যক হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বাধ্যতামূলক ইটিপি চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। ইটিপি স্থাপন করা এবং সর্বক্ষণ চালু রাখার জন্য বিশেষ মনিটরিংয়ের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর নিজস্ব লোকের মাধ্যমে টিম গঠন করবে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) :নদীর তীরে ইটভাটাগুলো বিসিক নদীর পাড়ে বা অদূরে স্থাপিত সব রাসায়নিক শিল্প-কারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলেছে তাদের সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা বাতিল করতে হবে। হাজারীবাগ ট্যানারি অবশ্যই অন্যত্র স্থানান্তর করতে হবে। ট্যানারি এখানে রেখে বুড়িগঙ্গা দূষণমুক্ত কল্পনা করাও ঠিক হবে না। ঢাকা দক্ষিণ এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন :নদীর তীরে ময়লা-আবর্জনা স্তূপীকরণ এবং নদীতে ডাম্পিং বন্ধ করতে হবে। নদীতীরে সব কাঁচাবাজারের সবুজ বর্জ্য, মনুষ্য বর্জ্য ও অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। সিটি করপোরেশনদ্বয় এ ব্যাপারে ঢাকাবাসীকে শতভাগ নিশ্চিত করবে। ঢাকা ওয়াসা :গৃহস্থালির স্যুয়ারেজ লাইনে বর্জ্য, মলমূত্রের নিষ্কাশন বুড়িগঙ্গায় অপসারণ দাপ্তরিক কৌশলে তা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণ করবে ঢাকা ওয়াসা। পানির লাইন, স্যুয়ারেজ লাইন সংযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিজস্ব ট্রিটমেন্ট পদ্ধতি উদ্ভাবন ও ব্যবহারে বাড়ির মালিক ও বাসিন্দাকে বাধ্য করার জন্য পত্র-আদেশ জারি করবে তারা। রাজউক : রাজউক কর্তৃক বরাদ্দকৃত অনুমোদিত প্লটে যেসব বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে তাদের গৃহস্থালি বর্জ্য স্যুয়ারেজ-সারফেজ লাইনে সংযোগ প্রদান করার প্রবণতা শক্তভাবে আইনি কর্তৃত্ব বন্ধ করবে। তার জন্য বিশেষ স্কোয়াড গঠন করা আবশ্যক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর :ঢাকা শহরের মধ্যে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে এবং শহরের এখানে-সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতো অভ্যন্তরে সহস্রাধিক হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নার্সিংহোম রয়েছে। এসব চিকিৎসা কেন্দ্রে সব ধরনের ক্লিনিক্যাল বর্জ্য নদীতে নির্বিচারে ডাম্পিং করা হয়। বুড়িগঙ্গা অথবা যত্রতত্র কোনো ক্লিনিক্যাল বর্জ্য অপসারণ করা যাবে না_ এ মর্মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সব হাসপাতাল, ক্লিনিকে নির্দেশনা প্রদান করবে। ভোক্তা অধিদপ্তর :বুড়িগঙ্গার তীরে শতাধিক কাঁচাবাজার স্থাপন করা হয়েছে। এসব বাজারের কাঁচা বর্জ্য, মৎস্য বর্জ্য, ফলমূলের বর্জ্য নিষ্পত্তির অন্যতম স্থান বুড়িগঙ্গা নদীগর্ভ। সব বাজার কমিটি ও সমিতিকে নিয়মমাফিক বাজার আয়োজন ও অব্যবস্থাপনার জন্য ভোক্তা অধিদপ্তর আইন মাফিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর : বুড়িগঙ্গায় লক্ষাধিক লঞ্চ, স্টিমার, ভলগেট, ইঞ্জিন বোর্ড, দেশীয় নৌকা ও ডিঙি নৌকা চলে। কিছু জাহাজের ওপর ভাসমান হোটেলও রয়েছে। নদীর তীরে শতাধিক শিপইয়ার্ড-ডকইয়ার্ড রয়েছে। জাহাজ নির্মাণের যত বর্জ্য পদার্থ ও রাসায়নিক পদার্থ নিদ্বর্িধায় নদীতে ফেলা হয়। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর বুড়িগঙ্গার তীরে স্থাপিত শিপইয়ার্ড, ডকইয়ার্ড এবং শিপের রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে প্রতিরোধ করার জন্য অভ্যন্তরীণ অধ্যাদেশ ১৯৮৭ মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। জেলা প্রশাসন, ঢাকা : ঢাকার দক্ষিণ পাশে বুড়িগঙ্গা নদীতীরের সব স্তরের মানুষকে বুড়িগঙ্গা রক্ষায় সচেতন করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র, সংসদ সদস্য, কমিশনার, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদসহ সব প্রতিষ্ঠানের সদস্য-প্রতিনিধিদের বুড়িগঙ্গা রক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করবে। তাদের সংগঠিত করার জন্য সভা, মতবিনিময় মিছিল, প্রচারণা, খেলাধুলা ইত্যাদির আয়োজন করবে। উচ্ছেদ, দূষণ প্রতিরোধ ইত্যাদির বিষয়ে আইন প্রয়োগের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ দিয়ে সহায়তা করবে। পুলিশ অধিদপ্তর, নৌসেনা ও কোস্টগার্ড :বুড়িগঙ্গা রক্ষা এটা প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ঢাকা শহরবাসীর জীবনের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বুড়িগঙ্গা রক্ষা, অপদখল, দূষণ, অপব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে স্বতঃস্ফূর্ত দায়িত্ব পালন করবে। ভূমি মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নীতিগত ও প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রদান করবে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় এ বিষয়গুলো সমন্বয় করবে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ওই সমন্বয়ে স্ট্র্যাটেজিক ও সময়োপযোগী পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করবে। সার্বক্ষণিক সদস্য, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা ঢাকা - ১২০৮