শিরোনাম
 ত্রিশালে বাস খাদে পড়ে নিহত ৩  গণভবনের বাইরে গুলিবিদ্ধ এসপিবিএন সদস্য মারা গেছেন  সাতক্ষীরায় দাদার হাতে নাতি খুন
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০১৬, ০১:২৫:১৬

দূষণে হালদার সর্বনাশ

আবু সাঈম, চট্টগ্রাম ব্যুরো
দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র চট্টগ্রামের হালদা নদী। বিভিন্ন দূষণের কারণে সর্বনাশ হচ্ছে নদীটির। জীববৈচিত্র্য হারিয়ে কমে যাচ্ছে কার্প জাতীয় মাছের রেণুর উৎপাদন। হারিয়ে যাচ্ছে নদীর নিজস্ব মাছও। রাবার ড্যাম, স্লুইস গেট এবং অপরিকল্পিতভাবে বাঁক কাটার কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে গেছে। বিভিন্ন ধরনের দূষণও সর্বনাশ করছে নদীর। নদীর স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে মন্ত্রণালয় থেকে ১৭ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কথা ছিল প্রতি মাসে একটি করে সভার মাধ্যমে করণীয় ঠিক করবে কমিটি। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গঠনের ৬ মাসেও কমিটির একটি সভাও হয়নি। প্রসঙ্গত, ২০১২ সালে এ নদী থেকে সংগৃহীত ডিমে রেণু হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০ কেজি। ২০১৫ সালে এসে তার পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র ১০৬ কেজিতে!

আশির দশক থেকে হালদা নিয়ে গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী। তিনি বলেন, 'হালদা হচ্ছে অনন্য বৈশিষ্ট্যের নদী। এখানে রয়েছে নানা প্রজাতির মা মাছ। ক্রমাগত রাবার ড্যাম এবং স্লুইস গেট নির্মাণ, বাঁক কেটে নদীর দূরত্ব কমানো, কলকারখানা এবং গৃহস্থালি বর্জ্যের কারেণ এ জীববৈচিত্র্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করছে। এর সঙ্গে রয়েছে প্রাকৃতিক কারণও। আবার মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হলেও সরকারের সুষ্ঠু তদারকির অভাবে প্রভাবশালীরা নির্বিচারে মা মাছ ধরছে। এ কারণেও আগের মতো মাছের ডিম পাওয়া যাচ্ছে না। হালদার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে প্রথমে মা মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে, পাশাপাশি অকেজো স্লুইস গেট

অপসারণ এবং পানির প্রবাহ যেন না কমে সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।'

২০১৫ সালে বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সোসাইটি থেকে প্রকাশিত একটি গবেষণামূলক নিবন্ধে হালদার জীববৈচিত্র্য তুলে ধরছেন আলী মোহাম্মদ আজাদী ও বান্দরবান সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. আরশাদ আলী। নিবন্ধ থেকে জানা যায়, হালদায় রয়েছে প্রায় ৯৩ প্রজাতির মাছ। এর মধ্যে শেল ফিশ ১০ প্রজাতির এবং ফিন ফিশ রয়েছে ৮৩ প্রজাতির। হালদায় নিজস্ব মাছের পাশাপাশি রয়েছে সামুদ্রিক মাছ, মোহনার মাছ, পুকুরের মাছ, প্লাবন ভূমির মাছ, বিলের মাছ। রাতের আঁধারে নির্বিচারে মা মাছ ধরা এবং অন্য নদীগুলোতে প্রজনন মৌসুমে মা ধরা বন্ধ না করার কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে মা মাছের রেণুর পরিমাণ। মশারির কাপড় দিয়ে তৈরি ঘিরা জালের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে গলদা চিংড়ি এবং অন্যান্য প্রজাতি মাছের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। জোয়ার-ভাটার কারণে জমির কীটনাশক নদীতে আসা এবং কারেন্ট জালের অত্যধিক ব্যবহারে এবং বড় মাছ ধরার ফাঁদও নদীর জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসাইন সমকালকে বলেন, 'মা মাছের নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এ সময় অবৈধ জাল জব্দ করার পাশাপাশি যারা মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত তাদেরও সাবধান করা হয়।'

মৎস্য অভয়ারণ্য

২০০৭ সালে সরকার হালদা নদীর নিম্নগতির দিকে প্রায় ২০ কিলোমিটার মৎস্য অভয়ারণ্য ঘোষণা করে। ঘোষণা অনুযায়ী হালদার মদুনাঘাট থেকে সত্তারঘাট ব্রিজ পর্যন্ত এ ২০ কিলোমিটার (ফেব্রুয়ারি-জুলাই) পাঁচ মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১০ সালে সরকার আরও ২০ কিলোমিটার অংশকে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়। এ নিয়ম অনুযায়ী মদুনাঘাট ব্রিজ থেকে নাজিরহাট পুরাতন ব্রিজ পর্যন্ত এ নিয়মের আওতায় আসে। হালদায় রয়েছে অনেক প্রজাতির নিজস্ব মাছ। এসব মাছের জীবনকাল ছয় মাস। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এসব মাছ মরে যায়। এতে হালদাপাড়ের প্রায় দুই হাজার জেলে পরিবারের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। মাছ ধরা বন্ধের সময় সরকার কিছু প্রণোদনা দিলেও

তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন জেলেরা।

রামদাশ হাট এলাকার শ্রীদাম জলদাস জানান, 'আমরা কোনো বড় মাছ ধরি না। ছোট ছোট চিংড়ি এবং পাঁচওয়া মাছ ধরি। পাঁচ মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকলে আমাদের জীবন চালাতে কষ্ট হয়। আবার সরকারি রিলিফও ঠিকমতো পাই না। যারা জেলে নয় তেমন লোকেরা রিলিফ নিয়ে নেয়। আর যা দেয় তা দিয়ে কিছুই হয় না।'

বিপন্ন প্রজাতি

এ নদীতে থাকা ৮৩ প্রজাতির মধ্যে এখন হুমকির মুখে ২০ প্রজাতির মাছ। অস্তিত্ব সংকটে থাকা তিনটি প্রজাতি হচ্ছে- পাঙাশ (দেশি), গারুয়া ও বাঁচা মাছ। নয়টি বিপন্ন প্রজাতি হচ্ছে কালিবাউশ, গনিয়া, লওবোকা, লেটিয়াস, কোশিও, রাসবোরা, পাবদা, অরগাস, আরমাটাস। শঙ্কাকুল আরও আটটি প্রজাতি হলো বেঙ্গালিয়েনসিন, নটোপেট্রাস, টিকটো, আওর, কাভাসিয়াস, নামা, রাঙ্গা, অরিয়েন্টাল।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারকে আহ্বায়ক করে হালদা নদীর অনন্য বৈশিষ্ট্য রক্ষা, কার্প জাতীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্রের প্রতিবেশ ব্যবস্থা সুরক্ষা, সর্বোপরি পানির প্রবাহ অক্ষুণ্ন ও পানির দূষণ রোধ তথা নদীর পরিবেশ সংরক্ষণকল্পে ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। হালদা নদীর গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মঞ্জুরুল কিবরিয়া সমকালকে বলেন, স্থানীয় ও পেশাজীবীদের চাপে কমিটি হলেও তার সুফল পাওয়া যায়নি।

হালদায় ডিম সংগ্রহকারীরা জানান, দিন দিন হালদায় মা মাছের ডিম কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন দূষণ এবং ওপর থেকে কম পানি আসা এবং সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে আশানুরূপ ডিম মিলছে না। হালদায় ১৫ বছর ধরে ডিম সংগ্রহ করছেন আমতোয়া এলাকার মো. আইয়ুব। তিনি বলেন, 'আগে যেখানে ১৫ থেকে ২০ বালতি ডিম পেতাম এখন তা এক-দুই বালতিতে নেমে এসেছে।' জেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রভাতী দেবী বলেন, '২০১২ সাল থেকে কমে যাচ্ছে হালদার মাছের ডিমের পরিমাণ।'
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved