শিরোনাম
 জাবির ৪২ শিক্ষার্থীর জামিন  ব্লগার রাজীব হত্যা মামলায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ  ভাস্কর্য অপসারণের প্রতিবাদকারী ৪ জনের জামিন  খালেদার বিরুদ্ধে কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা চলবে  সরিয়ে ফেলা ভাস্কর্য পুনঃস্থাপন অ্যানেক্স ভবনের সামনে
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০১৬

রাজনৈতিক দলের সম্মেলন ও নেতৃত্ব নির্বাচন

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ
মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম
বিএনপি ইতিমধ্যে জাতীয় কাউন্সিল সম্পন্ন করেছে এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আগামী জুলাই মাসে কাউন্সিলের পরিবর্তিত সময়সূচি ঘোষণা করেছে। বিএনপির কাউন্সিল ঘিরে দলগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক-পর্যবেক্ষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল এবং তা হওয়ারই কথা। কাউন্সিল দলের নেতৃত্বের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করে নতুন নেতৃত্ব বাছাই, সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে গঠনতন্ত্রকে সময়োপযোগী এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ নীতি-পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। কাউন্সিল একটা রাজনৈতিক দলকে দু'ভাবে সহায়তা করে। প্রথমত, কাউন্সিলররা দলীয় নেতৃত্বের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করতে, কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ চলার দিক সম্পর্কে অবহিত হতে এবং দল পরিচালনায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে পারেন। নেতৃত্বে নতুনদের অন্তর্ভুক্তির ফলে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার হয়। দ্বিতীয়ত, নির্বাচিত নেতৃত্ব দল পরিচালনায় তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। কিন্তু দেশের প্রধান দলগুলো যে প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব নির্বাচন করে তাতে দল পরিচালনায় গুণগত পরিবর্তনের পরিবর্তে কাউন্সিল হয়ে উঠে কেবল আনুষ্ঠানিকতা।
রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রথম ধাপ হলো প্রার্থী বাছাই। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৪ সালে প্রকাশিত 'বাংলাদেশের শাসন পরিস্থিতি' প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দলীয় গঠনতন্ত্রে দলের বিভিন্ন পদে প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে কোনো বর্ণনা নেই। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতৃত্বের জন্য দলগুলো দলীয় প্রধানের ওপর নির্ভরশীল।
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো কেন্দ্র থেকে ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। জাতীয় কাউন্সিলের আগে কেন্দ্র ছাড়া অন্যান্য স্তরে নেতৃত্ব নির্বাচন করার কথা। যেমন দলগুলো জেলা-মহানগর কমিটি গঠনের লক্ষ্যে ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের আয়োজন করে। অনেক ক্ষেত্রে তৃণমূলের মতামত-ভোট ছাড়াই কমিটি গঠন করা হয়। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুসারে, স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের আনুপাতিক অংশ কাউন্সিলর হিসেবে জাতীয় সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচন করেন। তারা নিজেরা যদি নিজ নিজ এলাকায় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নির্বাচিত না হন, তাদের ভোটে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কতটা গণতান্ত্রিক তা প্রশ্নসাপেক্ষ। বাস্তবে জাতীয় পর্যায়েও একই অবস্থা বিরাজমান। ২০০৯ সালের জুলাই এবং ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রধান দু'দলের জাতীয় কাউন্সিলে দলের সভাপতি-চেয়ারপারসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন এবং অন্যান্য পদে নেতা নির্বাচনের ক্ষমতা দলীয়প্রধানের ওপর ন্যস্ত করা হয়। গত ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে বিএনপি একই প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।
যাহোক, কাউন্সিল রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন করে দলের সর্বস্তরে প্রত্যক্ষ ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে রাজনৈতিক দল ও দেশ দু'ভাবে লাভবান হতে পারে। প্রথমত, দলের প্রধান নেতার প্রতি সাধারণ কর্মীদের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকলেও এ সমর্থনকে সাংগঠনিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেন দলের বিভিন্ন স্তরের নেতানেত্রী। তারা কর্মীদের দ্বারা নির্বাচিত হলে একদিকে কর্মীদের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি পায়; অন্যদিকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলের প্রয়োজনে কর্মীরা তাদের ডাকে সাড়া দিতে উদ্বুদ্ধ হন। দলের আদর্শের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল নেতাকর্মীর প্রয়োজনীয়তা রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে বেশি অনুভব করে। অন্যদিকে দলগুলো সরকারে থাকার সময় সংগঠনকে শক্তিশালী না করার পরিণতি বুঝতে পারে যখন নির্বাচনে হেরে যায়। তখন দলকে চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়। নব্বই-পরবর্তী এ পরিস্থিতি দুটি দলের মধ্যে পালাক্রমে ঘটেছে।
রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্য থেকে দেশের নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। নেতা হওয়ার প্রধান উপাদান হলো জনপ্রিয়তা। মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে এবং তাদের প্রত্যাশা ও সমস্যা অনুধাবন করে রাজনীতিকরা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। আর জনপ্রিয়তার পরিমাপ ঘটে নির্বাচনে। কিন্তু দলে যদি নেতৃত্ব বাছাইয়ে নির্বাচনী প্রথা দুর্বল থাকে, তাহলে নেতার জনপ্রিয়তা যাচাই কঠিন হবে। একজন নেতা দলের ভেতরে কতটা জনপ্রিয় তা নিশ্চিত না হয়ে তার পক্ষে দলকে জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় করার দায়িত্ব অর্পণ করা হলে দলের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন ব্যর্থ হবে। নির্বাচনের সুযোগ থাকলে দলে প্রজ্ঞাবান, সাহসী, ত্যাগী, প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিরা বিভিন্ন পদে আসীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অনুপস্থিতিতে, হঠাৎ আবির্ভূত ব্যক্তি অর্থের জোরে বা নেতৃস্থানীয় কারও আশীর্বাদের ওপর ভর করে নেতা হয়ে ওঠেন।
দ্বিতীয়ত, সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ নির্ভর করে রাজনৈতিক দলের ওপর। সংসদীয় গণতন্ত্রে মানুষ একটি দল বা জোটকে দেশ শাসনের ভার অর্পণ করে। রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের ন্যায় এখানে কোনো একক ব্যক্তিকে সরকারপ্রধান হিসেবে নির্বাচিত করা হয় না; বরং প্রত্যক্ষ ভোটে ৩০০ জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিত্বকারী দল প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করে, আর প্রধানমন্ত্রী অন্যান্য মন্ত্রী মনোনীত করেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয় যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে। সরকার যাবতীয় নির্বাহী কর্মকাণ্ডের জন্য সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। যেমন বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, 'মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকবে।'
সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন ও যৌথ নেতৃত্ব। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষমতা কাউন্সিলরদের হাতে ন্যস্ত করলে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের সত্যিকার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। এ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যের পরিবর্তে দলীয় স্বার্থের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীলতা নিশ্চিত হবে। এ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে এবং যে কোনো বৈরী পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।
রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্রায়নের পথে মাঝে মধ্যে আশার আলো দেখা যায়। সম্প্রতি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ভোটের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য দলীয় প্রার্থী মনোনীত করেছে। অন্যদিকে কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়েছে। এভাবে প্রত্যক্ষ ভোটের ব্যবস্থা থাকলে দলে নেতৃত্বের সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে। নেতৃত্ব প্রত্যাশী ব্যক্তিরা দলের কর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখতে সচেষ্ট হবেন এবং কর্মীরাও নেতৃত্ব প্রত্যাশীদের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের সুযোগ পাবেন। নির্বাচিত নেতৃত্ব দলের নীতি বাস্তবায়ন ও দলকে জনপ্রিয় করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সচেষ্ট হবে। নির্বাচিত নেতৃত্ব কাঙ্ক্ষিত ফল না দেখাতে পারলে পরবর্তী কাউন্সিলে অধিকতর যোগ্য নেতৃত্ব স্থলাভিষিক্ত হবেন। শেষে এগিয়ে যাবে দল, বিকশিত হবে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্র। কারণ পৃথিবীর সব দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের মান এক নয়। রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা এ পার্থক্য গড়ে দেয়। রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে চলবে সংসদীয় গণতন্ত্র সেরূপ লাভ করবে। দলের অভ্যন্তরে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্ব বাছাইয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না করে জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে সুষ্ঠু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। তাই আগে রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার দিকে নজর দিতে হবে।
i.sirajul1982@gmail.com
গবেষক, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved