শিরোনাম
 হাওরে সাড়ে আট লাখ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত  বিচারক ও আইনজীবীদের আরও মানবিক হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী  বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে জঙ্গি হামলা কমে যাবে: ওবায়দুল কাদের  সহায়ক সরকার ছাড়া আগামী নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না: ফখরুল
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০১৬

এ আগুন ছড়িয়ে পড়ূক সবখানে

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিনটি সামনে রেখে নারীর সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে 'মর্যাদায় গড়ি সমতা' প্রচারাভিযানের আওতায় সমকাল সুহৃদ সমাবেশ আয়োজন করে 'সমমর্যাদার যাত্রা'। আয়োজনে সুহৃদের সঙ্গে ছিল মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও মাত্রা। ২৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ অনুষ্ঠিত এ যাত্রা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তন হয়ে সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, দিনাজপুর, সৈয়দপুর অতিক্রম করে নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার জন্মভিটা রংপুরের পায়রাবন্দে গিয়ে শেষ হয়। পথযাত্রার পরিক্রমা নিয়ে লিখেছেন সঞ্জিত মণ্ডল...

নারী ও পুরুষের মধ্যে সবরকম সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্য দূর করে সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল 'সমমর্যাদার যাত্রা'। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে এ যাত্রার সূচনা করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর থেকে। শুরুতেই ছিল প্রতিজ্ঞায় বলিয়ান হওয়ার বিষয়টি। তরুণপ্রাণ সুহৃদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তন মুক্তিযুদ্ধের নামে শপথ করে সূচনা করে যাত্রার। সিরাজগঞ্জের কড্ডার মোড়, বগুড়ার শেরপুর, দিনাজপুরের সরকারি কলেজ, সৈয়দপুরের লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ হয়ে সমমর্যাদার যাত্রা শেষ হয় নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার জন্মভিটা রংপুরের পায়রাবন্দে গিয়ে। নারীর জন্য সমমর্যাদার এ যাত্রায় সুহৃদ সমাবেশের সঙ্গী ছিল বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, মাত্রাসহ স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। সহায়তা দিয়েছে ইউকেএইড। 'সমমর্যাদার যাত্রা'র সূচনা করে দেন দেশের বিশিষ্টজনরা। তারা বলেন, নারীর সমমর্যাদা শুধু স্লোগানে নয়, বাস্তব রূপ দিতে হবে। দেশের ৮৭ ভাগ নারী নিজগৃহে সহিংসতার শিকার। গৃহস্থালি কাজে একজন নারী গড়ে প্রায় ১৬ ঘণ্টা ব্যয় করলেও সামাজিকভাবে তার কোনো স্বীকৃতি নেই। নারীর গৃহস্থালি কাজের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে। উদ্বোধনী আয়োজনে বক্তব্য রাখেন দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ভাষাসংগ্রামী রওশন আরা বাচ্চু, সংসদ সদস্য শিরীন আখতার, কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, সমকালের নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) এস এম শাহাব উদ্দিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আবৃত্তিশিল্পী রূপা চক্রবর্তী, নাট্যব্যক্তিত্ব ও কর্মজীবী নারীর নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া রফিক বেবী, মাত্রার পরিচালক সানাউল আরেফিন ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক ও গবেষক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী। সঞ্চালনা করেন সমকালের ফিচার সম্পাদক মাহবুব আজীজ। আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ৯০ বছর আগে পায়রাবন্দ থেকে বেগম রোকেয়া পুরুষতান্ত্রিকতা তথা পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে একটা চিন্তার সূচনা করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন পিতৃতান্ত্রিকতা হলো সামন্তবাদী। বেগম রোকেয়া তার পদ্মরাগ উপন্যাসের নায়িকা সিদ্দিকাকে পুঁজিবাদ ও সামন্ততন্ত্রের শোষণে নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত হতে দেখিয়েছিলেন। ৯০ বছর পর আজ সে বিষয়ই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

শিরীন আখতার এমপি বলেন, সমমর্যাদা গড়তে গেলে আগে পুরুষের মানসিক বৈকল্য দূর করতে হবে। এটাই সবচেয়ে জরুরি। ছেলেরা তাদের অধিকার সম্পর্কে জানে, মেয়েরা তাহলে কেন জানবে না? পুরুষতান্ত্রিকতা মানে গণতন্ত্রহীনতা। আসুন নারী-পুরুষ সবাই মিলে গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করে নারীর সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করি।

ভাষাসংগ্রামী রওশন আরা বাচ্চু বলেন, '৫১ সালের আগে আমরা ছাত্রীরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তারা ছাত্রদের সঙ্গে কথা বললে ১০ টাকা ফাইন করা হতো। হোস্টেলের সিট বাতিল হয়ে যেত। সে সময়ে আমরা নারীরা মিছিল করেছি, ছাত্রদের সঙ্গে একসঙ্গে ভাষার জন্য আন্দোলন-লড়াই করেছি। পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙেছি। তাহলে এত বছর পরে আজও কেন নারীরা পিছিয়ে থাকবে? যতদিন না সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে ততদিন নারীদের এ আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।

আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, সমমর্যাদা রান্নাঘর থেকেই শুরু করা উচিত। আমার নিজের মাকে দেখেছি সারাক্ষণ রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। তিনি কখনও সুন্দরবন দেখেননি, সমুদ্র দেখেননি। জীবনের অনেক কিছুই তিনি অনুধাবন করেননি, কারণ তিনি এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন না। তাই নারীদের আগে নিজেদের সচেতন হতে হবে।

রোকেয়া রফিক বেবী বলেন, জীবন তো একটাই। এক জীবনের হাসি-কান্না, দুঃখ সবার একই। অথচ নারী এখনও মর্যাদায় সমাজে খাটো।

মেজর জেনারেল (অব.) এস এম শাহাব উদ্দিন বলেন, জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না নারী এমন কাজ করে পুরুষের তিনগুণ। অর্থনৈতিক মজুরিবিহীন এসব কাজের কোনো মূল্যায়ন হয় না। নারীরা যেন সমমর্যাদা পান সে জন্য সবাই মিলে কাজ করতে হবে।

বনশ্রী মিত্র নিয়োগী বলেন, দেশে জনসংখ্যার দিক থেকে নারী-পুরুষ সমান-সমান। অথচ অবস্থানের দিক থেকে নারীরা এখনও পিছিয়ে। ৮৭ ভাগ নারী এখনও নিজগৃহে নির্যাতনের শিকার। পরিবার গঠনে নারীর ভূমিকা মুখ্য হলেও পরিবারে তার অবদানগুলোর কোনো স্বীকৃতি নেই। সানাউল আরেফিন বলেন, প্রতিটি গৃহে 'মা'কে আমরা অনেক সম্মান করি, ভালোবাসি। অথচ মা যে গৃহস্থালি কাজগুলো করেন তার কোনো সম্মান আমরা দিই না। আমাদের মা, বোন, স্ত্রীর এই কাজগুলোকে সম্মানের চোখে দেখতে হবে।

অনুষ্ঠানে এসএ গেমসে স্বর্ণজয়ী মাবিয়া আক্তারকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এর জবাবে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে মাবিয়া বলেন, বিদেশের মাটিতে দেশের পতাকা ওড়াতে পেরেছেন, জাতীয় সঙ্গীত বাজাতে পেরেছেন, তার জন্য তিনি ধন্য। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অন্যান্য গেমসেও তিনি বাংলাদেশের পতাকা ওড়াতে চান।

'সমমর্যাদার যাত্রা'র উদ্বোধনের আগে সুহৃদ স্বর্ণময়ী ও তার দল সঙ্গীত পরিবেশন করে। তারা পরপর দুটি গণসঙ্গীতও গেয়ে শোনান। গণসঙ্গীতের পরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তন গিয়ে শপথ করেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সমকালের সহকারী সম্পাদক ও সুহৃদ সমাবেশের বিভাগীয় সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ, বিশেষ প্রতিনিধি সাবি্বর নেওয়াজ, সহৃদ সমাবেশের সহসম্পাদক আসাদুজ্জামান, মাত্রার সিইও খন্দকার আলমগীর, ক্যাম্পেইন লিডার আরিফুল ইসলাম, আহমেদ রেজাউল করিম, শফিকুল ইসলাম, মাজহারুল ইসলাম প্রমুখ।

'সমমর্যাদার যাত্রা' এ দিন বিকেল সাড়ে পাঁচটায় পেঁৗছে সিরাজগঞ্জের কড্ডার মোড়ে। সেখানে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যোগ দেয় সুহৃদরা। সেখান থেকে সন্ধ্যায় বগুড়ার শেরপুরে উপজেলা পরিষদ চত্বরে চলছিল বইমেলা। সেই বইমেলা চত্বরই ক্ষণিকের জন্য হয়ে ওঠে 'মর্যাদায় গড়ি সমতা'র মঞ্চ।

১ মার্চ

ঢাকায় শুরু হওয়া 'সমমর্যাদার যাত্রা' ১ মার্চ সকালে পেঁৗছায় দিনাজপুর। বেলা ১১টায় দিনাজপুর প্রেস ক্লাব থেকে জেলা শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে 'সমমর্যাদার পথযাত্রা' পেঁৗছায় সরকারি কলেজে। সেখানে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা, গণসঙ্গীত ও নারী-পুরুষের সমান অধিকার বিষয়ে নাটিকা প্রদর্শিত হয়। বক্তব্য রাখেন সমকালের সহকারী সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ, মাত্রার আরিফুল ইসলাম প্রমুখ।

আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন দিনাজপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবু বকর সিদ্দিক, উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন, সমকালের সহকারী সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান, দিনাজপুর প্রতিনিধি বিপুল সরকার সানি, মাত্রার ক্যাম্পেইন ব্যবস্থাপক আরিফুল ইসলাম আরিফ, দিনাজপুর সমকাল সুহৃদ সমাবেশের উপদেষ্টা নাট্যকার তারেকুজ্জামান তারেক, দিনাজপুর মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক রুবিনা আখতার, বেসরকারি সংস্থা উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক উম্মে নেহার, পল্লীশ্রীর ম্যানেজার সুরাইয়া আখতার, জেএসকেএসের মর্জিনা খাতুন রুপা, এমবিএসকের মোর্শেদা পারভীন মলি প্রমুখ। সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেন দিনাজপুর সমকাল সুহৃদ সমাবেশের সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ শিমুল, সাংগঠনিক সম্পাদক পাঞ্জাব আলী আক্কাস, তুষারশুভ্র বসাক, বিজয় চন্দ্র রায়, আলমগীর হোসেন, রাবি্বনুর আলম নুর, বিজয় দাস, পিয়াস সরকার, ফজিবর রহমান বাবু, সাহেব আলী, রফিক প্লাবন প্রমুখ। আলোচনা সভা শেষে স্থানীয় সংগঠন আমাদের থিয়েটারের পরিবেশনায় নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে একটি নাটিকা মঞ্চায়িত হয়। এর আগে স্থানীয় শিল্পীরা দলীয় ও একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

সৈয়দপুরে ১ মার্চ বিকাল ৩টা ১৫ মিনিটে লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ চত্বরে প্রবেশ করে সমমর্যাদার যাত্রার গাড়ি বহর। সৈয়দপুর প্রতিনিধি, সাকির হোসেন বাদলসহ সুহৃদ বন্ধুরা তাদেরকে অভর্থনা জানিয়ে নিয়ে যান হলরুমে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপাধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম কিশোর। সভাপতিত্ব করেন সমকাল সুহৃদ সমাবেশ সৈয়দপুর শাখার সভাপতি আমিরুল হক আরমান। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সুহৃদ সমাবেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক সনজিত মণ্ডল, মাত্রার আহম্মেদ রেজাউল করিম, শফিকুল ইসলাম, সমকাল সুহৃদ সমাবেশ সৈয়দপুর শাখার সম্পাদক ডেইজি আদানি, সহসভাপতি রেজা মাহমুদ প্রমুখ। বক্তব্য রাখেন সমকাল পত্রিকার সহ-সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান ও মাত্রার আরিফুল ইসলাম। আয়োজন শেষে সমমর্যাদার যাত্রা এগিয়ে যায় রংপুরের পায়রাবন্দের দিকে।

ঢাকা থেকে শুরু হওয়া 'সমমর্যাদার যাত্রা'র গাড়ি বহরে অংশ নেন সমকালের সহকারী সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ, মাত্রার আরিফুল ইসলাম,মাত্রার ইভেন্ট ব্যবস্থাপক আহমেদ রেজাউল করিম, শফিকুল ইসলাম, মাজহারুল ইসলাম, সহৃদ সমাবেশের সহসম্পাদক আসাদুজ্জামান, সমকাল সুহৃদ সমাবেশের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহৃদ সনজিৎ মণ্ডল।

হসাংগঠনিক সম্পাদক সুহৃদ সমাবেশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved