শিরোনাম
 সাত খুন মামলায় ১৫ জনের ফাঁসি বহাল, ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড  প্রধান বিচারপতির সঙ্গে গওহর রিজভীর সাক্ষাৎ  বিবিএস ক্যাবলসের অস্বাভাবিক দর তদন্তে কমিটি  বন্যাদুর্গত এলাকায় কৃষি ও এসএমই ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০১৬

'কাজে লাগাতে হবে প্রতিটি সময়কে'

নূরজাহান বেগম
জোহরা শিউলী :আপনার লেখালেখির শুরুর কথাটা জানতে চাই।

নূরজাহান বেগম :লেখাপড়ার বিষয়ে আমার বাবা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন খুবই সচেতন ছিলেন। তিনি বাড়িতে অনেক বাংলা_ইংরেজি সাময়িকী নিয়ে আসতেন। এর মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে ফুল, প্রজাপতি আর নানা প্রকার জীবজন্তুর ছবি দেখতাম। মূলত ছোটবেলা থেকেই বাবার সহায়তায় লেখালেখিতে আগ্রহী হয়ে উঠি। বাবা ১৯২৭ সালের দিকে 'সওগাত'-এ 'জানানামহল' নামে প্রথম নারীদের জন্য একটি বিভাগ চালু করেন। তারপর ১৯৩০ সালে 'সওগাত'-এ প্রথম মেয়েদের ছবি ও লেখা নিয়ে বিশেষ সংখ্যা বের করেন। তার পর থেকে 'সওগাত' ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বছরে একটা মহিলা সংখ্যা প্রকাশ করে। এসব প্রকাশনার সঙ্গে সব সময়ই বাবা আমাকে তার পাশে রেখেছেন। সেই থেকে শুরু। আমার মা লেখাপড়া জানতেন না, কিন্তু মেয়েদের ঘরের বাইরে আসা ও লেখালেখিতে উৎসাহ দিতেন। কাজ করতে করতে বাবা-মায়ের উৎসাহেই আমার লেখালেখিতে হাতেখড়ি।

ষ 'বেগম'-এর শুরুর কথা কি জানাবেন সমকালের পাঠকদের?

ষষ ১৯৪৬ সালে আমি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করি। বাবা আগে থেকেই মেয়েদের জন্য কিছু একটা করার চিন্তা করতেন। তিনি সে সময় বেগম সুফিয়া কামালকে তার চিন্তার কথা বললেন। তিনিও খুশি মনেই সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে রাজি হলেন। বাবার উদ্যোগেই ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই প্রথম প্রকাশিত হয় 'সাপ্তাহিক বেগম'। সম্পাদক বেগম সুফিয়া কামাল, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আমি। স্থির হয় 'বেগম'-এর প্রচ্ছদে মহিলাদের ছবি ছাপা হবে। হলোও তাই। পত্রিকার বিষয় ছিল নারী জাগরণ, কুসংস্কার বিলোপ, গ্রামগঞ্জের নির্যাতিত মহিলাদের চিত্র, পরিবার পরিকল্পনা, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের লেখা চিঠি ও মনীষীদের বাণী।

ষ আপনি যে সময়ে সাংবাদিকতা করতেন সে সময়ে তো নারীরা ঘরের বাইরেই বের হতে পারত না। বর্তমান সময়ের সঙ্গে তুলনা করে সেই সময়কে আপনি কীভাবে দেখেন?

ষষ সাংবাদিকতায় মহিলাদের সেকাল আর একালের ব্যবধানটা আসলে বিশাল। প্রথমাবস্থায় মহিলা সাংবাদিক বলতে কিছু ছিল না। কারণ সে সময় আমরা এত বেশি আব্রু থাকতাম যে, আমাদের বাইরে বেরিয়ে কিছু কাজ করা একেবারে নিষিদ্ধ ছিল। সে সময় মহিলারা বিশেষ বিশেষ বিষয়ে লিখতেন, তবে মুসলমান মেয়েরা খুব কম লেখালেখি করেছেন। তখনকার প্রচলিত নিয়মানুযায়ী সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়েদের হাতের লেখা, চেহারা বা তাদের ছবি কেউ দেখতে পারবে না। এই যে অবরোধমূলক ব্যবস্থা, সে কারণেই মেয়েরা লিখতে পারত না। তবে কিছু মেয়ে সওগাতের মহিলা সংখ্যায় লেখালেখি করতেন। সেই তুলনায় এখনকার মেয়েরা অনেক বেশি স্বাধীন।

ষ নারী সাংবাদিক তৈরি ও নারী-অগ্রগতির ক্ষেত্রে 'বেগম' পত্রিকার ভূমিকা সম্পর্কে যদি বলেন_

ষষ আমি মনে করি, নারী অগ্রগতি এবং নারী সাংবাদিক তৈরির ক্ষেত্রে 'বেগম' অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। বেগম প্রতিষ্ঠাকালে কিছুু লেখিকা আমরা পাই, যারা সওগাতে লিখে লিখে বেরিয়ে এসেছিলেন। তখন দেশের একটা দুঃসময় চলছে। চারদিকে দাঙ্গা। তখন পত্রিকায় ছবি ছাপা যেত না। পরিবারের লোকরা বলত, ছবি ছাপিয়ে কি বিয়ের বিজ্ঞাপন দেবে? আমার বাবা বিনামূল্যে পত্রিকা দিয়েছেন। যেখানেই কোনো মেয়ে অল্প কিছু লেখাপড়া জানে, সেখানেই বেগম পত্রিকা পাঠিয়েছেন। এভাবে মেয়েদের মধ্যে পড়ার একটা উৎসাহ জুগিয়েছেন। আমরা মনে করি, গ্রাম_গঞ্জে যেসব মেয়ে অবহেলিত, নিরক্ষর; 'বেগম' তাদের কথা বলে। বেগমে আমরা খুব উচ্চ মানের কবিতা, গল্প বা প্রবন্ধের প্রতি জোর দিই না। এখানে অতি সাধারণ মেয়েদের কথা তাদের মতো করে লেখা হয়।

ষ বেগম পত্রিকার উদ্দেশ্য কী ছিল? বেগমে কারা লিখতেন?

ষষ নারীদের সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল বেগমের উদ্দেশ্য। 'বেগম' পত্রিকায় গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, আলোচনা, মাতৃমঙ্গল, স্বাস্থ্য, সৌন্দর্যচর্চা, শিশুমঙ্গল, সেলাই, চিঠিপত্র, ছায়াছবির কথা ইত্যাদি বিষয়ে লেখা ছাপা হতো। ওই সময় নারী লেখকদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। লেখা সংগ্রহ করতে কষ্ট হতো। বিভিন্ন ইংরেজি পত্রিকা থেকে লেখা সংগ্রহ করে আমরা তা অনুবাদ করে দিতাম। 'সওগাত' নারী সংখ্যা করার জন্য নারীদের যে ছবি সংগ্রহ করা হয়েছিল; আমরা সেগুলো ব্যবহার করতাম। ব্লক করে ছবি ছাপাতে হতো। বেগমে লিখতেন কবি সুফিয়া কামাল, শামসুন নাহার মাহমুদ, কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, হামিদা খানম, মহসীনা আলী, সাঈদা খানম, হোসনে আরা মোদাব্বের, হুসনা বানু খানম, লুলু বিলকিস বানু, মালেকা পারভীন বানু, মাজেদা খাতুন, সারা খাতুন, জাহানারা আরজু, লায়লা সামাদ, নূরজাহান মুর্শিদ, মাফরুহা চৌধুরী প্রমুখ।

ষ বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমে যেসব নারী সাংবাদিক কাজ করছেন, তাদেরকে কর্মরত অবস্থায় দেখতে আপনার অনুভূতি কেমন হয়?

ষষ আমি খুবই আনন্দিত। আমি দেখে গেলাম। আমরা প্রচেষ্টা চালিয়েছিলাম_ সর্বক্ষেত্রে মেয়েরা এগিয়ে আসুক, দক্ষতার পরিচয় দিক। সে সময়ে মেয়েদের দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তারা কিছুই করতে পারত না। একটা মেয়ে গান গাইতে পারে, নাচতে পারে, ছবি আঁকতে পারে, ভালো অভিনয় জানে_ এসবের কিছুই তারা করতে পারত না। এদের দিয়ে হবে না_ এটা আমরা ভেঙেছি। আমরা মেয়েদের ঘরের বাইরে নিয়ে এসেছি, তাদের লেখা ছেপেছি, ছবি ছেপেছি। আমরা সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করেছি যে, যার যা প্রতিভা আছে সেটা বিকাশের পথ খুলে দিতেই হবে।

ষ নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত হিসেবে এ প্রজন্মের প্রতি আপনার কোনো দিকনির্দেশনা?

ষষ যেসব মেয়ে কর্মজীবী, তাদের জন্য এখনকার মহিলা সাংবাদিকদের চিন্তা করতে হবে। তারা যে শ্রম দিচ্ছে, পুরুষের তুলনায় কম পারিশ্রমিক পাচ্ছে_ এটা নিয়ে নারী সাংবাদিকদের লড়াই করতে হবে। দৈনিক পত্রিকাগুলোতে মেয়েদের বিষয় নিয়ে জায়গা খুব কম থাকে। সপ্তাহে ১টি কিংবা ২টি পাতা। আমি মনে করি, মেয়েদের তেমন কোনো স্থানই নেই দৈনিক পত্রিকায়। আগে কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প যেত; এখন ছোটখাটো নিউজ যায়। প্রতিদিনই ১টি কিংবা ২টি পাতা, খেলা, অর্থনীতি অথবা বিভিন্ন বিষয়ের জন্য থাকে। কিন্তু মেয়েদের জন্য কোনো পাতা থাকে না। এটার জন্যই আমাদের মেয়েরা অনেকটা পিছিয়ে আছে। কিছু পাক্ষিক, ত্রৈমাসিক বা সাপ্তাহিক পত্রিকা আছে, তাও ১-২ বছর বা ৩ বছর পর বন্ধ হয়ে যায়। নারীদের এগিয়ে নিতে অবশ্যই সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।

এখন তো পত্রিকাগুলোতে দলীয়করণ দেখি। বেগম এর সময়ে কোনো দলীয়করণ ছিল না। তাদের বড় পরিচয়, তারা লেখক। তোমরা নতুনরা নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম কর। তোমাকে যদি মেয়ে বলে অবহেলা করা হয়, তোমরা একজোট হয়ে প্রতিবাদ জানাও। তোমাদের জন্য পত্রিকায় জায়গা করে নাও। তোমাদের মধ্যে যদি দলাদলি থাকে, তাহলে দাবি আদায় করা সহজ হবে না। তোমাদের কাজের উন্নতির জন্য একজোট হয়ে আবেদন কর_ এটাই তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ। তোমরা পিছিয়ে থেকো না। অযথা সময় নষ্ট করো না। তোমাদের জন্য আমার অনেক দোয়া।
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved