শিরোনাম
 সুজানগরে মাছ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা  ফের গণমাধ্যমের ওপর চড়াও ট্রাম্প  এসপানিওলকে হারিয়ে শীর্ষে বার্সা
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৫, ০১:০৬:০৮

জালিয়াতি করে ৭৯ একর জমি দখল

হকিকত জাহান হকি ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
ভুয়া গেজেট করে রাজধানীর জোয়ার সাহারায় সরকারের অধিগ্রহণকৃত ৭৯ একর জমি দখল করে নিয়েছিল ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ফরম ও প্রকাশনা অফিসের নয় কর্মকর্তা। বর্তমান বাজারমূল্যে ওই জমির মূল্য এক হাজার কোটি টাকার বেশি। জালিয়াতি করে এই জমি দখলের ঘটনা ধরা পড়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়েরই এক তদন্ত প্রতিবেদনে। ওই নয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।

সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদনটি ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের কাছে পেশ করা হয়। মন্ত্রীর নির্দেশে ওই নয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে জালিয়াতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগটি দুদকের যাচাই-বাছাই কমিটি খতিয়ে দেখছে। পরে কমিশন অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেবে।

ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ সমকালকে বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে অবমুক্তকরণ গেজেট এরই মধ্যে বাতিল করে সরকারের জমি সরকারের দখলে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ভুয়া গেজেট জারির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। শিগগির তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা

নেওয়া হবে।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সরকারের অধিগ্রহণকৃত রাজধানীর ভাটারা ও খিলক্ষেত থানার জোয়ার সাহারা মৌজার বিভিন্ন সিএস দাগের ৭৯.১৯ একর জমির ভুয়া গেজেট প্রকাশ করে অবমুক্ত করা হয়েছিল। অধিগ্রহণকৃত ওই জমির অবমুক্তকরণ ভুয়া গেজেট প্রকাশ করে দখলে নিয়ে ভোগ করতে চেয়েছিল ভূমি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ফরম ও প্রকাশনা অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনে বেসরকারি খাতের যে কোনো জমি সরকার অধিগ্রহণ করে দখলে নিতে পারে। পরে অধিগ্রহণকৃত জমির কোনো অংশ সরকারের প্রয়োজন না হলে তা অবমুক্ত করে জমির আগের মালিকের কাছে ফেরত দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে অধিগ্রহণকৃত জমি সরকার অবমুক্ত করেনি, অর্থাৎ অধিগ্রহণ করা জমির কোনো অংশই সরকার আগের সেই মালিকদের ফেরত দেয়নি। কিন্তু ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ফরম ও প্রকাশনা অফিসের নয় কর্মকর্তা জালিয়াতি করে ভুয়া গেজেট প্রকাশ করে সরকারের অধিগ্রহণ করা জমির মধ্যে ৭৯ একর দখলে নিয়ে নেয়।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই জালিয়াতির সঙ্গে স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলও জড়িত আছে। তদন্তে তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। এর সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ বা অধিকতর অনুসন্ধান করে স্থানীয় অসাধু চক্রকে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালের ৪ নভেম্বর ওই জাল গেজেটটি প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, ১৩৮/৬১-৬২ নম্বর এলএ (ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন) কেসে হুকুম-দখলকৃত ৭৯ দশমিক ১৯ একর জমি অবমুক্ত করা হলো। এদিকে, ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ওই এলএ কেস অনুসারে ভূমি অবমুক্তকরণের গেজেট প্রকাশের জন্য কোনো প্রস্তাব সরকারের বিজি প্রেসে পাঠানো হয়নি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কোনো ফাইলে এই অবমুক্ত করার কোনো তথ্য নেই।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ও গত বছরের ২ অক্টোবর পৃথক আদেশে ১০ দশমিক ৯৭ একর ও ২ দশমিক ৩৬ একর জমির সরকারি গেজেট প্রকাশের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে বিজি প্রেসে প্রস্তাব পাঠানো হয়। প্রস্তাবনাগুলো পাঠানোর ছয় মাস পর অনুমোদনের জন্য প্রেসের মহাপরিচালকের কাছে একটি লিখিত আবেদন উপস্থাপন করা হয়। এখানেই বিধি বাম। ছয় মাস পর আবেদনটি উপস্থাপন করায় মহাপরিচালকের সন্দেহ হয়। পরে তিনি এ-সংক্রান্ত ফাইল খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি নির্দেশ দেন।

এ পর্যায়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওই সব কর্মকর্তা মোট ৭৯ দশমিক ১৯ একর জমি অবমুক্ত করার গেজেট প্রকাশের জন্য মৌখিকভাবে মহাপরিচালককে বারবার বলতে থাকেন। এ নিয়ে মহাপরিচালকের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। পরে তিনি বিষয়টি যাচাই করে দেখার জন্য বিজি প্রেস থেকে একটি প্রতিনিধি দল ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠান। পরে ফাইল ঘেঁটে জানা যায়, ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে গেজেট প্রকাশের জন্য কোনো প্রস্তাব বিজি প্রেসে পাঠানো হয়নি। পুরাতন ফাইল ঘেঁটে ২০১৩ সালে ৮৯ দশমিক ১৯ একর জমির একটি জাল গেজেট পাওয়া যায়।

এর পর জাল গেজেট প্রকাশের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে তদন্তের সুপারিশ করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ও বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ নির্দেশ অনুযায়ী ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (খাসজমি) শওকত আকবরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত টিম পুরো ঘটনা তদন্ত করেছে। টিমের অন্য দু'জন সদস্য হলেন উপসচিব (বাজেট) মো. মনিরুজ্জামান মিঞা ও উপসচিব (আইন-৩) কাজী শফিকুল আলম।

তদন্ত প্রতিবেদনে যে নয়জনকে জালিয়াতির জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে তারা হলেন_ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব (সাবেক অধিগ্রহণ-১ শাখা) মনিরুজ্জামান খান, সায়রাত-২ শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা সালেহা আক্তার, হিসাব শাখার অফিস সহকারী রেজাউল করিম, গ্রহণ ও প্রেরণ শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মনজুর হোসেন, বাংলাদেশ ফরম ও প্রকাশনা অফিসের সহকারী পরিচালক (প্রেস) আলমগীর হোসেন, উচ্চমান সহকারী মিজানুর রহমান, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর রাকিব উদ্দিন, সাবেক উপপরিচালক নজরুল ইসলাম ও বিজি প্রেসের স্টোর রিসিভার ইকবাল হোসেন।

জানা গেছে, শিগগির ওই সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রথমে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হবে। বরখাস্ত থাকা অবস্থায় তাদের বিরুদ্ধে আলাদাভাবে তদন্ত করা হবে। এ পর্যায়ের তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে জালিয়াতির প্রমাণ মিলবে, তাদের চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হবে। একই সঙ্গে দুদক অনুসন্ধান করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved