শিরোনাম
 আতিয়া মহলে দুই জঙ্গি নিহত, ভেতরে আরও আছে: ব্রিফিংয়ে সেনাবাহিনী  আতিয়া মহলে অভিযান চলছে, গুলি-বিস্ফোরণের শব্দ  জঙ্গিবাদ ছেড়ে সুপথে ফিরলে পুনর্বাসন: প্রধানমন্ত্রী  চুয়াডাঙ্গায় ট্রাক-ভটভটির সংঘর্ষে নিহত ১৩
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৫, ০১:০৪:৫২

ইসি উদ্বিগ্ন

মসিউর রহমান খান
পৌরসভা নির্বাচনের পরিবেশ ক্রমেই অবনতি হওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, বাড়ছে সহিংসতা। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইসির নির্দেশ আমলে নিতে চাইছেন না। স্থানীয় এমপির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে পুলিশের কর্মকাণ্ডে অনেকটাই অস্বস্তি ও বিব্রতবোধ করছে কমিশন।

ইসি কার্যালয়ের সূত্র জানায়, শুরুতে তিন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে মাঠ পর্যায়ে বার্তা পাঠাতে ইসির চেষ্টা বিফল হয়েছে। উল্টো পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব দেখানো হয়েছে। তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, চলমান পরিস্থিতিতে সহিংসতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে দৃঢ়তার ঘাটতি রয়েছে। তারা বলছেন, ইসির হুমকি-ধমকি সব মুখেই। বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই। এর প্রভাব পড়ছে মাঠ পর্যায়ে। একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনে সব ধরনের ক্ষমতাই ইসিকে দেওয়া রয়েছে। আইন প্রয়োগে দক্ষতার অভাব এবং নতজানু মনোভাবের কারণেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সমকালের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, সার্বিক পরিস্থিতিতে নির্বাচন সুষ্ঠু

.হওয়ার আশা অনেকটাই দুরূহ হয়ে পড়ছে। তারা আশঙ্কা করছেন, সামনের দিনে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশের তুলনায় এখন ইসির সামনে সহিংসতা ঠেকানোই বড় বিষয় হয়ে পড়েছে। উপজেলা নির্বাচনের তুলনায় এবার বেশি সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, সবাই অসহযোগিতা করবে, আর পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন করবে_ এমন আশা করা সবার জন্যই বোকামি। রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও ভোটারদের সহযোগিতা ছাড়া ইসির পক্ষে নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব নয়। কমিশন তার সাধ্যমতো শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাবে। আমরা আমাদের বিবেকের কাছে পরিষ্কার।

ইসি সূত্র জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল ইসি কার্যালয়ে গিয়ে সিইসির সঙ্গে দেখা করে অন্তত ১৭টি পৌরসভায় সুনির্দিষ্টভাবে তাদের প্রচারকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তোলে। এসব অভিযোগের বেশির ভাগ স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া অন্তত ১৪টি থানার ওসির বিরুদ্ধে স্থানীয় এমপির নির্দেশে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষাবলম্বনের অভিযোগ রয়েছে। বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ প্রার্থী ইসিতে লিখিতভাবে এ অভিযোগ দায়ের করেছেন। কমিশনের নির্দেশে এখন পর্যন্ত তিনটি থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আরও ছয়টি থানার ওসির বিরুদ্ধে ইসি তদন্ত করছে।

তবে ইসি সূত্র দাবি করেছে, কমিশনের এই পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। কমিশন সদস্যদের সঙ্গে আলাপচারিতায় এ মনোভাবের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গত শনিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বৈঠকের কার্যবিবরণীতে দেখা গেছে, আইজিপি বলেছেন, 'পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়ার পর ওই সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।' ওই বৈঠকে কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য সরবরাহের ব্যাপারেও অপারগতা প্রকাশ করেন আইজিপি। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে আইজিপিকে পাওয়া যায়নি।

কমিশনের একটি সূত্র জানায়, পুলিশের বিরুদ্ধে এতসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশপ্রধানকে তলবের পরিকল্পনা নিয়েছিল ইসি। তবে সদর দপ্তরের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে সে সিদ্ধান্ত থেকে তারা সরে এসেছেন। আজ-কালের মধ্যেই কমিশন থেকে এ বিষয়ে লিখিতভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হতে পারে। তবে কমিশন সদস্যদের মধ্যেও এ নিয়ে দ্বিমত রয়েছে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সমকালকে বলেছেন, কমিশন যে ক'জন ওসিকে প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে, তা এরই মধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। নির্বাচন কমিশনে ওসিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা সবাই এখন কমিশনের তত্ত্বাবধানে কাজ করছেন। নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিষয়ে আমাদের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। তাদের বদলি বা শাস্তির বিষয়টি পুরোপুরি এখন ইসির হাতে। কমিশন যেভাবে চাইবে, সেভাবেই হবে।

ইসি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের এ পর্যন্ত অর্ধশত ঘটনা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের চিঠি দেওয়া হলেও তাতে সাড়া মেলেনি। এবার ইসি কার্যালয় থেকেই চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইসির উপসচিব রকিবউদ্দীন মণ্ডলের স্বাক্ষরে ১৮ এমপিসহ বেশ কয়েকজন মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে আজ চিঠি পাঠানো হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজশাহীর বাগমারার তাহেরপুরের আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ, বরগুনা সদর পৌরসভার আওয়ামী লীগ মনোনীত ও বিদ্রোহী দুই প্রার্থী শাহাদাৎ হোসেন ও কামরুল আহসান মহারাজ, নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভার বিএনপি প্রার্থী মো. ইলিয়াস, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও পৌরসভার বিএনপি প্রার্থী নাসিরউদ্দিন, কুষ্টিয়ার কুমারখালীর আওয়ামী লীগ প্রার্থী শামসুজ্জামান অরুণসহ বেশ ক'জন।

এর আগে এসব এমপি ও প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইসি কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়ে তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসির চিঠির জবাব দেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করেননি।

এদিকে, শরীয়তপুর জেলার সদর, নড়িয়া, জাজিরা, ডামুড্যা ও ভেদরগঞ্জ পৌরসভার বিএনপি মনোনীত সব প্রার্থী গতকাল ইসিতে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, এরই মধ্যে তাদের প্রচারকাজে নানা ধরনের বাধা দেওয়া হচ্ছে। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রয়োজন নেই বলে প্রচার চালানো হচ্ছে। এর আগে নড়িয়া পৌরসভার নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করে সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী ইসিতে উপস্থিত হয়ে লিখিত দিয়েছেন বলেও বিএনপির প্রার্থীদের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসির করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ইসি শুরুতেই মাঠ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে সহিংসতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পুলিশের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আইজিপির পরামর্শ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি হলে ইসি সব নির্বাচন একসঙ্গে না করে ধাপে ধাপে করতে পারে। কিছু পৌরসভায় নির্বাচন বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমান কমিশন দিয়ে তা সম্ভব হবে কি-না, এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অসংখ্য অনিয়মের ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত কমিশনের তরফে কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল বা কাউকে জেল-জরিমানা করতে পারেনি ইসি। তাদের হুমকি-ধমকি সব মুখেই সীমাবদ্ধ। এতেই প্রমাণ হয়, ইসির সক্ষমতা নেই অথবা তাদের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে যে শৃঙ্খলা নেই, তা এই নির্বাচনে ফুটে উঠেছে। সামনের দিনে আরও বেশি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি হওয়ারও আশঙ্কা ব্যক্ত করেন তিনি। আচরণবিধি লঙ্ঘনে সরকারপ্রধানের হস্তক্ষেপ কামনায় ইসির অসহায়ত্ব ফুঠে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved